জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ছে, বাড়ছে প্রবালের বিবর্ণ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও। বিশ্বের বহু অঞ্চলে প্রবাল প্রাচীর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিপন্ন হয়ে পড়ছে অসংখ্য সামুদ্রিক প্রাণীর আবাসস্থল। এই সংকট মোকাবিলায় বিজ্ঞানীরা কাজে লাগাচ্ছেন এক অভিনব কৌশল—সমুদ্রের তলদেশে লাউডস্পিকারের মাধ্যমে বাজানো হচ্ছে সুস্থ প্রবাল প্রাচীরের প্রাকৃতিক শব্দ। মাছের ডাক, চিংড়ির খসখসে শব্দ এবং সামুদ্রিক জীবনের পরিচিত আওয়াজ যেন এক ধরনের ‘ঘুমপাড়ানি গান’ হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাল এলাকায় প্রাণ ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা তৈরি করছে।
তবে এই শব্দ প্রবালকে সরাসরি সারিয়ে তোলে না। বরং মাছ ও প্রবালের লার্ভাকে উপযুক্ত আবাসস্থলের দিকে আকৃষ্ট করতে সাহায্য করে। এর ফলে প্রবাল প্রাচীর পুনরুদ্ধারের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া জোরদার হতে পারে। গবেষকদের পরীক্ষায় দেখা গেছে, সুস্থ প্রবাল এলাকার শব্দ বাজালে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে মাছের উপস্থিতি এবং কিছু প্রজাতির প্রবাল লার্ভার বসতি স্থাপনের হার বাড়তে পারে।
সুস্থ প্রবাল প্রাচীরের শব্দ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
দূর থেকে প্রবাল প্রাচীরকে নীরব মনে হলেও সমুদ্রের নিচে সেখানে চলে নানা ধরনের শব্দের সমাহার। মাছ খাবার খোঁজার সময়, নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের সময় কিংবা এলাকা রক্ষা করতে গিয়ে বিভিন্ন শব্দ তৈরি করে। ছোট চিংড়িরা তাদের বিশেষ অঙ্গের সাহায্যে তীক্ষ্ণ খসখসে আওয়াজও সৃষ্টি করে। এসব শব্দ একসঙ্গে মিলে তৈরি করে একটি জীবন্ত সামুদ্রিক শব্দজগৎ।
অন্যদিকে, প্রবাল ধ্বংস হয়ে গেলে কিংবা মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর সংখ্যা কমে গেলে সেই এলাকার শব্দও অনেকটা বদলে যায়। ফলে সুস্থ প্রবাল প্রাচীরের তুলনায় ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল সামুদ্রিক প্রাণীদের কাছে কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, সমুদ্রের তলদেশে সুস্থ প্রবাল এলাকার শব্দ বাজিয়ে এই পার্থক্য কিছুটা কমানো সম্ভব। শব্দের মাধ্যমে মাছ ও অন্যান্য প্রাণীকে ক্ষতিগ্রস্ত আবাসস্থলের প্রতি আকৃষ্ট করা গেলে সেখানে আবার জীববৈচিত্র্য বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
লাউডস্পিকারের পরীক্ষায় মিলেছে আশাব্যঞ্জক ফল
অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অঞ্চলে পরিচালিত একটি পরীক্ষায় গবেষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাল এলাকায় পানির নিচে লাউডস্পিকার বসিয়ে সুস্থ প্রবাল প্রাচীরের শব্দ বাজান। প্রায় ছয় সপ্তাহের এই পরীক্ষায় শব্দ শোনানো এলাকায় মাছের নতুন সদস্যের আগমন ও উপস্থিতি বেড়েছিল। পরীক্ষার শেষে এসব এলাকায় কিশোর মাছের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এলাকার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ এবং মাছের প্রজাতিগত সমৃদ্ধি প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি পাওয়া যায়।
আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, সুস্থ প্রবাল এলাকার শব্দ শুনলে কিছু প্রজাতির প্রবাল লার্ভা সমুদ্রের তলদেশে বসতি স্থাপনে বেশি আগ্রহ দেখায়। যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জে পরিচালিত পরীক্ষায় গলফ বল প্রবাল নামে পরিচিত এক প্রজাতির লার্ভার ক্ষেত্রে প্রথম ৩৬ ঘণ্টায় শব্দের ইতিবাচক প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষ করা হয়।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় বিপন্ন একটি প্রবাল প্রজাতির লার্ভার বসতি স্থাপনে শব্দের প্রভাব পরীক্ষা করা হয়েছে। এসব গবেষণা ইঙ্গিত দেয়, শব্দভিত্তিক পদ্ধতি শুধু মাছ আকৃষ্ট করতেই নয়, প্রবাল পুনরুদ্ধারের কিছু ধাপেও সহায়ক হতে পারে।
প্রবাল প্রাচীর রক্ষায় কীভাবে কাজে লাগবে এই পদ্ধতি?
প্রবাল প্রাচীর সমুদ্রের অসংখ্য প্রাণীর আশ্রয়স্থল। মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ি এবং নানা ধরনের অমেরুদণ্ডী প্রাণী এই বাস্তুতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল। প্রবাল ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাদের খাদ্য সংগ্রহ, আশ্রয় ও প্রজননের সুযোগও কমে যায়। আবার এসব প্রাণীর উপস্থিতি প্রবাল প্রাচীরের পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখতেও ভূমিকা রাখে।
শব্দভিত্তিক পুনরুদ্ধার পদ্ধতির উদ্দেশ্য হলো ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে প্রাণীদের ফিরে আসার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা। মাছ ফিরে এলে খাদ্যজাল ও বাস্তুতন্ত্রের বিভিন্ন প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একইভাবে, বেশি প্রবাল লার্ভা উপযুক্ত স্থানে বসতি স্থাপন করলে ভবিষ্যতে নতুন প্রবাল গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও বাড়তে পারে।
তবে শুধু লাউডস্পিকার বসালেই প্রবাল প্রাচীর আগের অবস্থায় ফিরে আসবে না। প্রবালকে টিকে থাকতে উপযুক্ত পানির তাপমাত্রা, পানির গুণমান, পর্যাপ্ত আলো এবং স্থিতিশীল আবাসস্থল প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে একা যথেষ্ট নয়
বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্রবালের জন্য বড় হুমকি। অতিরিক্ত তাপে প্রবাল তাদের শরীরে বসবাসকারী খাদ্য তৈরিতে সহায়তাকারী শৈবাল হারিয়ে ফেলতে পারে। এ প্রক্রিয়াকে প্রবালের বিবর্ণতা বলা হয়। দীর্ঘ সময় এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে প্রবাল দুর্বল হয়ে মারা যেতে পারে।
এ ছাড়া সমুদ্রের অম্লতা বৃদ্ধি, দূষণ, অতিরিক্ত মাছ ধরা এবং উপকূলীয় উন্নয়নও প্রবাল প্রাচীরের ক্ষতি করে। ফলে শব্দের সাহায্যে মাছ ও লার্ভাকে আকৃষ্ট করা গেলেও পানির তাপমাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে গেলে বা পরিবেশ দূষিত থাকলে পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে পারে।
গবেষকদের সামনে এখন গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো কোন ধরনের শব্দ, কতক্ষণ এবং কত দূরত্ব পর্যন্ত বাজালে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়, তা নির্ধারণ করা। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে এই পদ্ধতির কার্যকারিতা ও সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
সব মিলিয়ে, সমুদ্রের তলদেশে সুস্থ প্রবাল প্রাচীরের শব্দ বাজানোর কৌশল সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এটি জলবায়ু পরিবর্তন থামানোর বিকল্প নয়, বরং প্রবাল পুনরুদ্ধারের অন্যান্য উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হলে কার্যকর সহায়ক পদ্ধতি হয়ে উঠতে পারে।
