বিশ্বের মাত্র নয়টি দেশের হাতে রয়েছে পারমাণবিক অস্ত্র। এসব দেশের কাছে সম্মিলিতভাবে প্রায় ১২ হাজার ২০০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে, যার বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মজুত। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা গবেষকদের ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্রের মোট সংখ্যা কমলেও সামরিকভাবে ব্যবহারযোগ্য অস্ত্রের মজুত এবং আধুনিকায়নের প্রতিযোগিতা নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।
পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা নিয়ে সঠিক হিসাব পাওয়া কঠিন। কারণ অধিকাংশ দেশ তাদের অস্ত্রভাণ্ডারের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করে না। ফলে আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলো সরকারি তথ্য, প্রকাশ্য নথি, ঐতিহাসিক রেকর্ড ও বিভিন্ন গোয়েন্দা মূল্যায়নের ভিত্তিতে আনুমানিক হিসাব তৈরি করে।
বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পারমাণবিক অস্ত্র কোন দেশের?
২০২৬ সালের জানুয়ারির হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়ার কাছে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার। যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে। এই দুই দেশের হাতেই বিশ্বের মোট পারমাণবিক ওয়ারহেডের প্রায় ৮৬ শতাংশ রয়েছে। সামরিক মজুতের হিসাবে তাদের সম্মিলিত অংশ প্রায় ৮৩ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক গবেষকদের হিসাবে, রাশিয়ার মোট অস্ত্রভাণ্ডারে আনুমানিক ৫ হাজার ৪২০টি ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রায় ৫ হাজার ৪২টি ওয়ারহেড রয়েছে। তবে এর সবগুলো সক্রিয়ভাবে মোতায়েন করা নয়। কিছু অস্ত্র সামরিক ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত বা সংরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে, আর কিছু অবসরপ্রাপ্ত অস্ত্র ধ্বংস করার অপেক্ষায় আছে।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। মোট অস্ত্রভাণ্ডারের সংখ্যা এবং সামরিকভাবে ব্যবহারযোগ্য অস্ত্রের সংখ্যা এক নয়। একইভাবে ক্ষেপণাস্ত্র বা বিমানে মোতায়েন করা ওয়ারহেডের সংখ্যা মোট মজুতের তুলনায় অনেক কম।
কোন দেশের কাছে কতটি পারমাণবিক ওয়ারহেড
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, নয়টি পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশের মোট অস্ত্রভাণ্ডারের চিত্র নিচে দেওয়া হলো।
১. রাশিয়া — প্রায় ৫ হাজার ৪২০টি
২. যুক্তরাষ্ট্র — প্রায় ৫ হাজার ৪২টি
৩. চীন — প্রায় ৬২০টি
৪. ফ্রান্স — প্রায় ৩৭০টি
৫. যুক্তরাজ্য — প্রায় ২২৫টি
৬. ভারত — প্রায় ১৯০টি
৭. পাকিস্তান — প্রায় ১৭০টি
৮. ইসরায়েল — প্রায় ৯০টি
৯. উত্তর কোরিয়া — প্রায় ৬০টি
সব মিলিয়ে বিশ্বে আনুমানিক ১২ হাজার ১৮৭টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। এই মোট সংখ্যার মধ্যে সামরিক মজুতে থাকা অস্ত্রের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত হলেও এখনো পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়নি, এমন ওয়ারহেডও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
চীনের অস্ত্রভাণ্ডার দ্রুত বাড়ছে
পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা বিবেচনায় চীন বর্তমানে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। দেশটির কাছে আনুমানিক ৬২০টি ওয়ারহেড রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে অন্যান্য প্রধান পারমাণবিক শক্তির তুলনায় চীনের অস্ত্রভাণ্ডার সম্প্রসারণের গতি বেশি।
চীন নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, উৎক্ষেপণ অবকাঠামো এবং পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম সামরিক সরঞ্জাম উন্নয়নে বিনিয়োগ করছে। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সাইলো নির্মাণও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজরে এসেছে।
এই সম্প্রসারণ ভবিষ্যতে বিশ্বশক্তিগুলোর মধ্যে সামরিক ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে চীনের ভবিষ্যৎ অস্ত্রভাণ্ডারের আকার নির্ভর করবে উৎপাদন, সামরিক কৌশল এবং অস্ত্র মোতায়েনসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।
ভারত ও পাকিস্তানের হাতে কতটি অস্ত্র
দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ। আনুমানিক হিসাবে ভারতের কাছে প্রায় ১৯০টি এবং পাকিস্তানের কাছে প্রায় ১৭০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে।
দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ, সীমান্তসংক্রান্ত উত্তেজনা এবং একাধিক সামরিক সংঘাতের ইতিহাস রয়েছে। ফলে তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা আঞ্চলিক নিরাপত্তার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
ভারত স্থল, আকাশ ও সমুদ্রভিত্তিক পারমাণবিক সক্ষমতা গড়ে তুলেছে। পাকিস্তানও বিভিন্ন পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য বাহকের মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা বজায় রাখছে। তবে উভয় দেশের প্রকৃত মজুত, প্রস্তুতির মাত্রা এবং মোতায়েনসংক্রান্ত তথ্যের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের পারমাণবিক শক্তি
ইউরোপে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য পারমাণবিক অস্ত্রধারী দুটি দেশ। ২০২৬ সালের আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, ফ্রান্সের মোট অস্ত্রভাণ্ডারে প্রায় ৩৭০টি এবং যুক্তরাজ্যের কাছে প্রায় ২২৫টি ওয়ারহেড রয়েছে।
ফ্রান্সের পারমাণবিক প্রতিরোধব্যবস্থায় সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র এবং যুদ্ধবিমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যুক্তরাজ্যের পারমাণবিক সক্ষমতার মূল ভিত্তি হলো পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র।
মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলকে ব্যাপকভাবে পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের কথা স্বীকার বা অস্বীকার করে না। আন্তর্জাতিক গবেষকদের হিসাবে, ইসরায়েলের কাছে আনুমানিক ৯০টি ওয়ারহেড রয়েছে।
উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতা
উত্তর কোরিয়া বিশ্বের নবম পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ। দেশটির কাছে আনুমানিক ৬০টি সংযোজিত ওয়ারহেড রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে এর প্রকৃত সংখ্যা এবং কতগুলো অস্ত্র তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহারের উপযোগী, সে বিষয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে।
দেশটি একাধিক পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছে এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নের কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। এর ফলে পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয় হয়ে রয়েছে।
১২ হাজারের বেশি অস্ত্রের সবগুলো কি ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত?
না। বিশ্বে থাকা সব পারমাণবিক ওয়ারহেড একই অবস্থায় নেই। গবেষকদের ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, মোট ১২ হাজার ১৮৭টির মধ্যে প্রায় ৯ হাজার ৭৪৫টি সামরিক মজুতের অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে আনুমানিক ৪ হাজারটি ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমানসহ বিভিন্ন সামরিক ব্যবস্থায় মোতায়েন রয়েছে। বাকিগুলোর একটি অংশ সংরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত অস্ত্রগুলোও মোট হিসাবের অন্তর্ভুক্ত, যদিও সেগুলো ধ্বংস করার অপেক্ষায় রয়েছে।
মোতায়েন করা অস্ত্রের মধ্যেও সবগুলো একই মাত্রার প্রস্তুতিতে থাকে না। কিছু ওয়ারহেড উচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়, যাতে প্রয়োজনে অল্প সময়ের মধ্যে ব্যবহার করা যায়। তবে প্রস্তুতির মাত্রা দেশভেদে ভিন্ন এবং সব তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায় না।
বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা কমছে, নাকি বাড়ছে?
শীতল যুদ্ধের সময় বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা ১৯৮৬ সালে প্রায় ৭০ হাজার ৩০০টিতে পৌঁছেছিল। পরবর্তী দশকগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার অস্ত্রভাণ্ডার কমানোর ফলে মোট সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই হ্রাসের গতি ধীর হয়েছে।
স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ২০২৬ সালের মূল্যায়নে জানিয়েছে, নয়টি পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশই নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার আধুনিকায়ন করছে। চীন, ভারত, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশের অস্ত্রভাণ্ডার বাড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক চুক্তির দুর্বলতা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা পারমাণবিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা দিয়ে কোনো দেশের সামরিক সক্ষমতার পুরো চিত্র বোঝা যায় না। অস্ত্রের বিস্ফোরণক্ষমতা, বহনব্যবস্থা, নির্ভুলতা, প্রস্তুতির মাত্রা এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ। তবু বর্তমান হিসাব একটি বিষয় স্পষ্ট করে—বিশ্বের পারমাণবিক অস্ত্রের বিপুল অংশ এখনো মাত্র দুটি দেশের হাতে, আর অন্য দেশগুলোও নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো বা আধুনিকায়নের পথে রয়েছে।
