ইসরায়েলের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটকে নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। এর মধ্য দিয়ে ইসরায়েলের ক্ষমতার সমীকরণে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। রোববার (৮ নভেম্বর) আনুষ্ঠানিকভাবে আইজেনকটের হাতে সরকার গঠনের দায়িত্ব তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর সরকার গঠন নিয়ে দেশটিতে যে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, প্রেসিডেন্টের এই সিদ্ধান্তে তা নতুন মোড় নিয়েছে। নির্বাচনে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি একক দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি তাঁর নেতৃত্বাধীন জোট। অন্যদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থন নিয়ে এগিয়ে রয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান ও ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকট।
তবে প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে দায়িত্ব পেলেই যে তাঁর সরকার গঠন নিশ্চিত হয়ে যাবে, বিষয়টি এমন নয়। বরং রাজনৈতিকভাবে পরস্পরবিরোধী দলগুলোকে এক জায়গায় এনে কার্যকর জোট তৈরি করাই হবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
আইজেনকটের পক্ষেই বেশি সংসদ সদস্যের সমর্থন
ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ গত কয়েক দিনে দেশটির পার্লামেন্ট নেসেটে নির্বাচিত বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন। এসব আলোচনায় কোন নেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়া উচিত, সে বিষয়ে দলগুলোর মতামত জানতে চান তিনি।
আলোচনায় ৬৭ জন সংসদ সদস্যের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলো গাদি আইজেনকটের পক্ষে সমর্থন জানায়। অন্যদিকে ৪৬ জন সংসদ সদস্যের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো নেতানিয়াহুকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার সুপারিশ করে। সাত সদস্যের একটি দল কোনো পক্ষের প্রতি সমর্থন জানায়নি।
এই সুপারিশের পরও তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নেননি হারজগ। কারণ, শুধু সংসদ সদস্যদের সংখ্যার ভিত্তিতে সরকার গঠনের সক্ষমতা নির্ধারণ করা কঠিন। বিশেষ করে আইজেনকটের পক্ষে থাকা দলগুলোর মধ্যে আদর্শগত ও রাজনৈতিক মতপার্থক্য রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে নেতানিয়াহু ও আইজেনকটসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে আরও আলোচনা করেন প্রেসিডেন্ট। সব দিক বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত আইজেনকটকেই প্রথম সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানান তিনি।
নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক আধিপত্যে চ্যালেঞ্জ
ইসরায়েলের রাজনীতিতে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একাধিক মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে আবারও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার নানা রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে।
এবারের নির্বাচনে তাঁর লিকুদ পার্টি ২৭টি আসন পেয়ে একক দল হিসেবে এগিয়ে থাকলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি। নেতানিয়াহুর সমর্থক জোটের মোট আসন দাঁড়িয়েছে ৫৩টি।
অন্যদিকে আইজেনকটের ইয়াশার পার্টি পেয়েছে ২১টি আসন। তাঁর বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের দলগুলো সম্মিলিতভাবে আরও বেশি আসনের সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে আরব রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান এবং অন্যান্য দলের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে এই সমীকরণ এখনো জটিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত তাই শুধু সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নয়, বরং নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্যের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
সাবেক সেনাপ্রধানের সামনে কঠিন জোটের পরীক্ষা
গাদি আইজেনকট ইসরায়েলের সাবেক সেনাপ্রধান। সামরিক বাহিনীতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনীতিতেও নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন তিনি। ইয়াশার পার্টির নেতৃত্ব দিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া আইজেনকট এবার নেতানিয়াহুবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে একত্র করার অন্যতম কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছেন।
তবে তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, তাঁকে সমর্থন দেওয়া দলগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে মতবিরোধ রয়েছে।
বিশেষ করে আরব রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করা হবে কি না, তা নিয়ে বিরোধী শিবিরের মধ্যেই মতপার্থক্য রয়েছে। ইসরায়েলের কয়েকটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল আরব দলগুলোকে নিয়ে সরাসরি সরকার গঠনের বিরোধিতা করে আসছে।
অন্যদিকে আরব দলগুলোর সম্মিলিত আসনসংখ্যা ১৯। ফলে তাদের সমর্থন ছাড়া সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা আইজেনকটের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
একটি সম্ভাবনা হলো, আরব দলগুলোর এক বা একাধিক দলকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করা। আরেকটি পথ হতে পারে, তাদের সরাসরি মন্ত্রিসভায় না রেখে সংসদের বাইরে থেকে সরকারের প্রতি সমর্থন আদায় করা। তবে উভয় ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন হবে।
সরকার গঠনে সময় পাবেন ২৮ দিন
প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পাওয়ার পর আইজেনকট প্রাথমিকভাবে ২৮ দিন সময় পাবেন নতুন সরকার গঠনের জন্য। প্রয়োজন হলে প্রেসিডেন্ট তাঁকে আরও ১৪ দিন সময় বাড়িয়ে দিতে পারবেন।
এই সময়ের মধ্যে তাঁকে বিভিন্ন দলের সঙ্গে আলোচনা করে মন্ত্রিসভার কাঠামো, নীতিগত অবস্থান এবং সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।
ইসরায়েলের ১২০ সদস্যের নেসেটে সরকার গঠনের জন্য অন্তত ৬১ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। অর্থাৎ শুধু নির্বাচনে ভালো ফল করলেই সরকার গঠন করা যায় না, সংসদে কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতাও নিশ্চিত করতে হয়।
আইজেনকট নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকার গঠন করতে ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট নতুন করে অন্য কোনো নেতাকে সুযোগ দিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর আবারও সরকার গঠনের চেষ্টা করার সম্ভাবনা রয়েছে। সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে দেশটিতে নতুন নির্বাচনের পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
ইসরায়েলের নীতিতে আসতে পারে পরিবর্তন?
আইজেনকটের সম্ভাব্য সরকার গঠন শুধু ক্ষমতার পালাবদলের প্রশ্ন নয়, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতিতেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করছে।
বিশেষ করে গাজা যুদ্ধ, ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সম্পর্ক, সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ এবং দেশের নিরাপত্তানীতির মতো বিষয়গুলো নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
আইজেনকট অতীতে সামরিক নেতৃত্বে দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেলে রাজনৈতিক সমঝোতা এবং আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
এদিকে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও এখন অনেকটাই নির্ভর করছে আইজেনকটের সরকার গঠনের সাফল্য বা ব্যর্থতার ওপর।
সব মিলিয়ে, ইসরায়েলের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আইজেনকট কি পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে এক ছাতার নিচে এনে নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটাতে পারবেন, নাকি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ধরে রাখার আরেকটি সুযোগ তৈরি হবে নেতানিয়াহুর জন্য?
আসন্ন কয়েক সপ্তাহের রাজনৈতিক দর-কষাকষিই এর উত্তর নির্ধারণ করবে।
