দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনীতিতে তিন দশকের বেশি সময় ধরে আধিপত্য ধরে রাখা আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের (এএনসি) জনপ্রিয়তা আরও কমে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে। ভোট গণনার শেষ পর্যায়ে এসে দলটি পেয়েছে প্রায় ৩২ শতাংশ ভোট। নির্বাচনী বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস বলছে, চূড়ান্ত ফলাফলে এই হার নেমে ৩১ শতাংশের কাছাকাছি হতে পারে। এমনটি হলে স্থানীয় নির্বাচনে দলটির জন্য তৈরি হবে নতুন রেকর্ড—১৯৯৪ সালে বর্ণবাদী শাসনের অবসানের পর থেকে এত কম ভোট আর পায়নি এএনসি। অন্যদিকে বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (ডিএ) প্রায় ২৪ থেকে ২৫ শতাংশ ভোট নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।
শুক্রবার ৯০ শতাংশ ভোট গণনা শেষে প্রকাশিত তথ্য থেকে এই চিত্র পাওয়া গেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনৈতিক ইতিহাসে এএনসির অবস্থান ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসার পর দলটি দীর্ঘদিন জাতীয় ও স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুর্নীতি, বেকারত্ব, অপরাধ, বিদ্যুৎ ও পানির সংকট এবং স্থানীয় পরিষেবার দুর্বলতা দলটির জনপ্রিয়তায় বড় ধাক্কা দিয়েছে।
৩২ শতাংশে নেমে এল এএনসি
ভোট গণনার ৯০ শতাংশ শেষে এএনসির ভোটের হার ছিল প্রায় ৩২ শতাংশ। ডিএ পেয়েছে প্রায় ২৪ শতাংশ ভোট। দক্ষিণ আফ্রিকার কাউন্সিল ফর সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চূড়ান্ত ফলাফলে এএনসির ভোটের হার দাঁড়াতে পারে প্রায় ৩১ শতাংশে। ডিএর ক্ষেত্রে তা হতে পারে ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
২০২১ সালের স্থানীয় নির্বাচনে এএনসি পেয়েছিল প্রায় ৪৬ শতাংশ ভোট। সেই নির্বাচনেই দলটি প্রথমবারের মতো জাতীয় পর্যায়ে স্থানীয় নির্বাচনে ৫০ শতাংশের নিচে নেমে যায়। এবার সম্ভাব্য ৩১ শতাংশের ফল দলটির জন্য আরও বড় বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে এএনসি ৪০ শতাংশের নিচে ভোট পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। এর ফলে দলটিকে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী ডিএসহ কয়েকটি দলের সঙ্গে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করতে হয়। স্থানীয় নির্বাচনেও সমর্থন কমে যাওয়ায় দলটির রাজনৈতিক ভিত্তি আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কেন কমছে ক্ষমতাসীন দলের জনপ্রিয়তা
এএনসির জনপ্রিয়তা কমার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা। দক্ষিণ আফ্রিকায় বেকারত্ব দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। তরুণদের একটি বড় অংশ কাজ পাচ্ছে না। একই সঙ্গে অপরাধ ও সহিংসতা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
দেশটির অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, পানির সংকট, ভাঙাচোরা সড়ক এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা স্থানীয় সরকারের প্রতি মানুষের অসন্তোষ বাড়িয়েছে। এসব পরিষেবা দেওয়ার দায়িত্ব স্থানীয় পৌর কর্তৃপক্ষের। তাই স্থানীয় নির্বাচনে ভোটারদের ক্ষোভ সরাসরি ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে প্রতিফলিত হয়েছে।
দুর্নীতির অভিযোগও এএনসির ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দলটির বিভিন্ন নেতা ও সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি এবং অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার থাকলেও বর্তমান প্রজন্মের ভোটারদের কাছে কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও কার্যকর সেবা এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বড় শহরগুলোতে জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনা
নির্বাচনের ফলাফলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বড় শহরগুলোর নিয়ন্ত্রণ। জোহানেসবার্গ ও প্রশাসনিক রাজধানী প্রিটোরিয়াকে কেন্দ্র করে থাকা তশওয়ানের মতো মহানগর এলাকায় কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে এসব শহরে জোট সরকার গঠনের আলোচনা শুরু হতে পারে।
ডিএ কেপটাউনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার পথে রয়েছে। অন্যদিকে জোহানেসবার্গের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরে এএনসি বা ডিএ—কোনো দলই এককভাবে সরকার গঠনের মতো অবস্থানে নেই বলে প্রাথমিক হিসাব ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জাতীয় পর্যায়ে এএনসি ও ডিএ একসঙ্গে সরকারে থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে তাদের মধ্যে আদর্শগত মতপার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে জাতিগত বৈষম্য দূর করতে নেওয়া নীতি, অর্থনৈতিক পুনর্বণ্টন এবং সরকারি সেবার কাঠামো নিয়ে দুই দলের অবস্থান আলাদা। ফলে স্থানীয় সরকার গঠনে তাদের সমঝোতা সহজ হবে না।
জ্যাকব জুমার দলের উত্থানও উদ্বেগের কারণ
এএনসির ভোট কমার পেছনে সাবেক প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমার সমর্থিত উমখোন্তো উই সিজওয়ে পার্টির উত্থানও গুরুত্বপূর্ণ। দলটি এএনসির ঐতিহ্যবাহী সমর্থকদের একটি অংশকে নিজেদের দিকে টানতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে কোয়াজুলু-নাটাল অঞ্চলে দলটির প্রভাব নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
ডারবানকেন্দ্রিক ইথেকুইনি পৌরসভায় ফলাফল এখনো অনিশ্চিত। সেখানে জুমার দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে কি না, তা দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। এএনসির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা এই রাজনৈতিক শক্তি দলটির পুরোনো ভোটব্যাংকে চাপ সৃষ্টি করছে।
বর্ণবাদ-পরবর্তী রাজনীতির নতুন বাস্তবতা
১৯৯৪ সালে বর্ণবাদী শাসনের অবসানের পর এএনসি দক্ষিণ আফ্রিকার মুক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছিল। নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বে দলটি ক্ষমতায় আসে এবং পরবর্তী কয়েক দশক ধরে দেশটির রাজনীতিতে প্রাধান্য বজায় রাখে। কিন্তু ঐতিহাসিক ভূমিকা এখন আর ভোট ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট হচ্ছে না।
ভোটারদের একটি বড় অংশ মনে করছে, রাজনৈতিক স্বাধীনতার সুফল অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে সমানভাবে পৌঁছায়নি। আয়বৈষম্য, বেকারত্ব ও সরকারি সেবার ঘাটতি সেই হতাশা বাড়িয়েছে। তরুণ ভোটারদের কাছে অতীতের সংগ্রামের চেয়ে বর্তমানের কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার মান বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এএনসির সামনে কঠিন পুনর্গঠনের পরীক্ষা
স্থানীয় নির্বাচনে সম্ভাব্য এই বিপর্যয় এএনসির নেতৃত্বের জন্য বড় সতর্কবার্তা। দলটির সামনে এখন সংগঠন পুনর্গঠন, দুর্নীতির অভিযোগ মোকাবিলা এবং স্থানীয় সরকারে কার্যকর সেবা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ। শুধু ঐতিহাসিক জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতের নির্বাচন জেতা কঠিন হবে।
অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর জন্যও সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে জোট সরকার গঠন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। শহর পরিচালনা, বাজেট, পানি-বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের বাস্তব সক্ষমতা দেখাতে হবে।
দক্ষিণ আফ্রিকার স্থানীয় নির্বাচনের ফল তাই কেবল পৌরসভা নিয়ন্ত্রণের লড়াই নয়; এটি দেশটির রাজনীতিতে নতুন যুগের ইঙ্গিত। এএনসির দীর্ঘ আধিপত্য ভেঙে বহুদলীয় প্রতিযোগিতা আরও জোরালো হচ্ছে। আগামী দিনে দলটি নিজেদের জনপ্রিয়তা ফিরিয়ে আনতে পারে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
