মিয়ানমারের কারাবন্দি গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চির শারীরিক ও মানসিক অবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। পাঁচ বছরের বেশি সময় পর ছেলে কিম অ্যারিসের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন ৮১ বছর বয়সী এই নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী নেত্রী। কথোপকথনের পর ছেলে জানিয়েছেন, তাঁর কণ্ঠে শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্ত থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে মায়ের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত এবং তিনি প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অ্যারিস।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে সু চি বন্দিত্বে রয়েছেন। দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর অবস্থান, স্বাস্থ্য এবং দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন ছিল। ফলে সাম্প্রতিক ফোনালাপকে তাঁর পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, এই সীমিত যোগাযোগ কি তাঁর প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝার জন্য যথেষ্ট?
পাঁচ বছরের বেশি সময় পর কথা
গত ২২ অক্টোবর মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে আটক সু চির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন তাঁর ছেলে কিম অ্যারিস। যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী অ্যারিসের সঙ্গে এই কথোপকথনটি ছিল পাঁচ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে তাঁদের প্রথম সরাসরি যোগাযোগ।
অ্যারিসের ভাষ্য অনুযায়ী, কথা বলার সময় তাঁর মাকে মোটামুটি সুস্থ মনে হয়েছে। তিনি পরিবারের সদস্যদের খোঁজ নিয়েছেন এবং ছেলের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে বয়স ৮১ হওয়ায় শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই দুশ্চিন্তা রয়েছে বলে জানিয়েছেন অ্যারিস।
মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ এই ফোনালাপের ছবি প্রকাশ করে জানায়, এটি ছিল একটি আনুষ্ঠানিক পারিবারিক বা কনস্যুলার যোগাযোগ। কথোপকথন প্রায় ২০ মিনিট স্থায়ী হয়। তবে কী কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, তার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
সু চি কি প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন?
ছেলের উদ্বেগের মূল জায়গা হলো, সু চি কার সঙ্গে দেখা করতে পারছেন এবং তাঁর আশপাশে কারা রয়েছেন—সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্যের অভাব। অ্যারিসের ধারণা, তাঁর মায়ের সঙ্গে সামরিক বাহিনী বা পুলিশের বাইরে অন্য কারও নিয়মিত যোগাযোগ নেই। ফলে তিনি কার্যত একাকী বন্দিত্বের মতো পরিস্থিতিতে রয়েছেন।
সু চির আইনজীবী ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগও দীর্ঘদিন ধরে সীমিত ছিল। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলায় সাজা দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতি, নির্বাচনী অনিয়ম, রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন অভিযোগে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সু চি এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে তাঁর পক্ষ থেকে আগে জানানো হয়েছে।
তাঁর অবস্থান সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের অভাব আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে বয়স, দীর্ঘ বন্দিত্ব এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পারিবারিক যোগাযোগের সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অভ্যুত্থানের পর থেকে বন্দিত্ব
মিয়ানমারে ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক বাহিনী নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। ওই সময় সু চি, প্রেসিডেন্ট উইন মিন্ট এবং ক্ষমতাসীন দলের বহু নেতাকে আটক করা হয়। সামরিক বাহিনী নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে ক্ষমতা দখলের পক্ষে যুক্তি দেয়। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের বড় অংশ সেই অভিযোগের পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণের অভাবের কথা জানিয়েছে।
অভ্যুত্থানের পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন-পীড়নের মুখে আন্দোলন সশস্ত্র প্রতিরোধে রূপ নেয়। বর্তমানে মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক বাহিনী, জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন এবং জান্তাবিরোধী বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ চলছে। এই পরিস্থিতিতে সু চির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত।
সামরিক সরকারের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন
সাম্প্রতিক ফোনালাপের আগে মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ সু চির কিছু ছবি প্রকাশ করেছিল। এমনকি যুক্তরাজ্যের রাজা তৃতীয় চার্লসের পাঠানো একটি উপহার গ্রহণের ছবিও সামনে আনা হয়। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, আন্তর্জাতিক সমালোচনা কমানো এবং সু চির অবস্থার বিষয়ে আশ্বস্ত করার চেষ্টা হিসেবে এসব তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে।
তবে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সীমিত যোগাযোগের সুযোগ দিলেই তাঁর বন্দিত্বের পরিবেশ সম্পর্কে সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। ফোনালাপের সময় কথোপকথন পর্যবেক্ষণ করা হয়ে থাকতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে। অ্যারিস জানিয়েছেন, তাঁরা সংবেদনশীল রাজনৈতিক বিষয়ে কথা বলেননি, কারণ তাঁদের ধারণা ছিল কথোপকথনটি রেকর্ড করা হতে পারে।
আন্তর্জাতিক চাপ ও ভবিষ্যৎ
সু চির মুক্তি এবং রাজনৈতিক বন্দিদের বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহল দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। জাতিসংঘ, বিভিন্ন দেশ ও মানবাধিকার সংগঠন মিয়ানমারের সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে রাজনৈতিক সংলাপ এবং বন্দিদের মুক্তির দাবি জানিয়েছে। কিন্তু দেশটির চলমান সংঘাত ও রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে অগ্রগতি সীমিত।
সু চির ছেলে জানিয়েছেন, মায়ের কণ্ঠ শুনে তিনি কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন, কিন্তু তাঁর সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। একজন বন্দির শারীরিক ও মানসিক অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে নিয়মিত চিকিৎসা, স্বাধীন পর্যবেক্ষণ এবং পরিবারের সঙ্গে অবাধ যোগাযোগের সুযোগ প্রয়োজন।
পাঁচ বছর পর এই ফোনালাপ তাই একদিকে স্বস্তির খবর, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার কথাও মনে করিয়ে দিয়েছে। সু চি কেমন আছেন, কোথায় ও কী পরিবেশে থাকছেন এবং তাঁর চিকিৎসা ও আইনি অধিকার কতটা নিশ্চিত—এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হওয়ার নয়।
