মানুষের কণ্ঠস্বর শুধু পরিচয় জানানোর মাধ্যম নয়, এর ভেতরে লুকিয়ে থাকতে পারে শরীর ও মস্তিষ্কের বয়স বাড়ার নানা সংকেত। এবার কণ্ঠের স্বর, কথা বলার গতি, বিরতি, শব্দের ব্যবহারসহ ভাষার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে মানুষের বয়স অনুমান করতে সক্ষম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক একটি প্রযুক্তি তৈরি করেছেন গবেষকেরা। ‘স্পিচ ক্লক’ নামের এই প্রযুক্তি মানুষের প্রকৃত বয়সের সঙ্গে তার কণ্ঠস্বর থেকে অনুমান করা বয়সের পার্থক্যও নির্ণয় করতে পারে। গবেষকদের আশা, ভবিষ্যতে এটি মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ও বয়সজনিত কিছু সমস্যার প্রাথমিক ইঙ্গিত শনাক্ত করার সহজ উপায় হয়ে উঠতে পারে।
কীভাবে কাজ করে স্পিচ ক্লক?
সাধারণভাবে মানুষের বয়স নির্ধারণ করা হয় জন্মতারিখের ভিত্তিতে। কিন্তু একই বয়সের দুজন মানুষের শারীরিক সক্ষমতা, মস্তিষ্কের কার্যক্রম কিংবা সুস্থতার মাত্রা এক রকম নাও হতে পারে। এ কারণে গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরেই এমন কিছু সূচক তৈরির চেষ্টা করছেন, যা কেবল ক্যালেন্ডারের বয়স নয়, বরং মানুষের শরীর কতটা দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগোচ্ছে, সে সম্পর্কেও ধারণা দিতে পারে।
এ ধরনের প্রযুক্তিকে সাধারণভাবে ‘এজিং ক্লক’ বা বয়স নির্ণায়ক ঘড়ি বলা হয়। কিছু প্রযুক্তি রক্তের নমুনা, জিনগত পরিবর্তন কিংবা মস্তিষ্কের স্ক্যানের তথ্য ব্যবহার করে। নতুন স্পিচ ক্লক সেখানে ভিন্ন পথ অনুসরণ করে। এটি মানুষের কথা বলার ধরন বিশ্লেষণ করে বয়সের একটি অনুমান তৈরি করে।
প্রযুক্তিটি কণ্ঠস্বরের উচ্চতা বা স্বরের ওঠানামা, কথা বলার গতি, শব্দের মধ্যে বিরতি, শব্দভান্ডারের বৈচিত্র্য এবং কথার অর্থ প্রকাশের ধরনসহ শত শত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করতে পারে। মেশিন লার্নিং পদ্ধতিতে এসব বৈশিষ্ট্য থেকে বয়সের সঙ্গে সম্পর্কিত ধরন শনাক্ত করে মডেলটি।
প্রায় তিন হাজার মানুষের বক্তব্য বিশ্লেষণ
গবেষণাটিতে আর্জেন্টিনা, চিলি, কলম্বিয়া, মেক্সিকো ও পেরুর মোট ২ হাজার ৯২৮ জন স্প্যানিশভাষী মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সুস্থ ব্যক্তি ছাড়াও মৃদু জ্ঞানীয় সমস্যায় আক্রান্ত এবং আলঝেইমারসহ বিভিন্ন ধরনের ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত মানুষ ছিলেন।
অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন ধরনের কথা বলার কাজ দেওয়া হয়। তাঁদের বক্তব্যের অডিও রেকর্ডিং থেকে কণ্ঠস্বর ও ভাষা ব্যবহারের বৈশিষ্ট্য সংগ্রহ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এরপর মডেলটি কণ্ঠের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে অংশগ্রহণকারীদের বয়স অনুমান করে।
গবেষকেরা প্রকৃত বয়স এবং স্পিচ ক্লকের অনুমান করা বয়সের পার্থক্যকে ‘স্পিচ এজ গ্যাপ’ বা কথন-বয়সের ব্যবধান হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কারও প্রকৃত বয়স ৬০ বছর হলেও কণ্ঠের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে প্রযুক্তিটি যদি ৬৮ বছর অনুমান করে, তাহলে তাঁর স্পিচ এজ গ্যাপ হবে আট বছর। এটি কেবল ব্যাখ্যার জন্য একটি কাল্পনিক উদাহরণ; গবেষণায় সবার ক্ষেত্রে এমন ফল পাওয়া যায়নি।
কণ্ঠে বয়সের ছাপ, মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যেও ইঙ্গিত
গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁদের কথা বলার ধরন তাঁদের প্রকৃত বয়সের তুলনায় বেশি বয়সী মানুষের মতো, তাঁদের মধ্যে জ্ঞানীয় সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু লক্ষণ তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে। আলঝেইমার রোগ এবং ফ্রন্টোটেম্পোরাল ডিমেনশিয়ার মতো কিছু অবস্থার সঙ্গে কথন-বয়সের ব্যবধানের সম্পর্কও পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ ও সমস্যা সমাধানের মতো কিছু সক্ষমতার পরীক্ষার ফলের সঙ্গেও এই ব্যবধানের সম্পর্ক দেখা গেছে। গবেষণার কিছু বিশ্লেষণে মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যক্রমের পরিবর্তন এবং জৈবিক বার্ধক্যের নির্দিষ্ট সূচকের সঙ্গেও যোগসূত্র পাওয়া গেছে।
কেন এমন হয়, তার একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো—কথা বলা একটি জটিল মস্তিষ্কনির্ভর প্রক্রিয়া। শব্দ নির্বাচন, স্মৃতি থেকে তথ্য উদ্ধার, বাক্য গঠন, আবেগ প্রকাশ এবং কথার গতি নিয়ন্ত্রণ করতে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ একসঙ্গে কাজ করে। বয়স বাড়ার সঙ্গে এসব প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন ঘটতে পারে, আর তার কিছু প্রতিফলন কণ্ঠস্বর ও ভাষা ব্যবহারে দেখা যেতে পারে।
তবে কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন মানেই যে কারও মস্তিষ্কে রোগ হয়েছে, এমন নয়। ঘুমের ঘাটতি, মানসিক চাপ, বিষণ্নতা, শারীরিক অসুস্থতা, ভাষা ও সামাজিক পরিবেশও কথা বলার ধরনে প্রভাব ফেলতে পারে।
স্বাস্থ্য পরীক্ষায় কী পরিবর্তন আনতে পারে এই প্রযুক্তি?
স্পিচ ক্লকের সম্ভাব্য বড় সুবিধা হলো, এটি ব্যবহার করতে ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি বা শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহের প্রয়োজন নাও হতে পারে। সাধারণ মাইক্রোফোনে ধারণ করা কয়েক মিনিটের বক্তব্য বিশ্লেষণ করেই বয়স-সম্পর্কিত কিছু সংকেত পাওয়া সম্ভব হতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে দূরবর্তী স্বাস্থ্যসেবা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ কিংবা সীমিত চিকিৎসাসুবিধা রয়েছে এমন অঞ্চলে এটি কাজে লাগতে পারে।
একই ব্যক্তির কণ্ঠস্বর সময়ের ব্যবধানে বিশ্লেষণ করা গেলে তাঁর কথন-বয়সের ব্যবধান বাড়ছে, কমছে, নাকি স্থিতিশীল থাকছে—তা নিয়েও গবেষণা করা সম্ভব। তবে এ ধরনের ব্যবহার কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য করতে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন।
রোগ নির্ণয়ের বিকল্প নয়
গবেষণাটির ফল আশাব্যঞ্জক হলেও স্পিচ ক্লক এখনই ডিমেনশিয়া বা আলঝেইমার শনাক্ত করার স্বীকৃত স্বতন্ত্র পরীক্ষা নয়। কণ্ঠের ভিত্তিতে পাওয়া বয়সের অনুমান কোনো ব্যক্তির প্রকৃত জৈবিক বয়সের নির্ভুল মাপও নয়। এটি মূলত গবেষণায় দেখা বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কের একটি পরিমাপক।
এ ছাড়া বর্তমান গবেষণায় স্প্যানিশভাষী পাঁচটি লাতিন আমেরিকান দেশের মানুষ অংশ নিয়েছেন। বাংলা, ইংরেজি কিংবা অন্য ভাষাভাষীদের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিটি একই রকম নির্ভুল ফল দেবে কি না, তা নিশ্চিত করতে আলাদা প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষা প্রয়োজন। বিভিন্ন ভাষার উচ্চারণ, কথার গতি এবং সাংস্কৃতিক পার্থক্য ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, মানুষের কণ্ঠস্বর বিশ্লেষণ করে বয়স ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার গবেষণায় স্পিচ ক্লক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। ভবিষ্যতে আরও বড় ও বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর ওপর পরীক্ষা সফল হলে, সাধারণ কথোপকথনের অডিওই হয়তো বয়সজনিত পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের একটি সহজ সহায়ক উপকরণ হয়ে উঠতে পারে। তবে চিকিৎসা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে কণ্ঠস্বরের বিশ্লেষণের পাশাপাশি প্রয়োজন হবে পেশাদার চিকিৎসকের মূল্যায়ন ও অন্যান্য পরীক্ষার।
