পৃথিবীতে কোটি কোটি বছর আগে দাপিয়ে বেড়ানো ভয়ংকর শিকারি টাইরানোসরাস রেক্স বা টি-রেক্সের শরীরের তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৩৬ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ, এই বিশালাকার ডাইনোসরের শরীরের তাপমাত্রা ছিল আধুনিক মানুষের কাছাকাছি এবং হাতির মতো বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীর তাপমাত্রার সঙ্গে তুলনীয়। সম্প্রতি জীবাশ্ম দাঁতের রাসায়নিক বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এমন তথ্য পেয়েছেন, যা প্রাগৈতিহাসিক এই প্রাণীর শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে নতুন ধারণা দিচ্ছে।
গবেষণাটি ডাইনোসরদের শরীরের তাপমাত্রা কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হতো, সে বিষয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। বিশেষ করে টি-রেক্সের মতো বিশাল শিকারি প্রাণী কীভাবে সক্রিয় থাকত এবং বিভিন্ন পরিবেশে টিকে থাকতে পারত, তা বোঝার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
দাঁতের জীবাশ্মেই মিলল শরীরের তাপমাত্রার সূত্র
টি-রেক্সের শরীরের তাপমাত্রা নির্ণয় করতে গবেষকেরা তিনটি জীবাশ্ম দাঁতের এনামেলের রাসায়নিক গঠন পরীক্ষা করেন। দাঁতের এনামেল দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকতে পারে এবং এর মধ্যে সংরক্ষিত কিছু রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য প্রাণীটি জীবিত অবস্থায় কী তাপমাত্রায় ছিল, সে সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।
এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা কার্বন ও অক্সিজেনের বিশেষ আইসোটোপের বিন্যাস বিশ্লেষণ করেন। এই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট আইসোটোপগুলো খনিজ কাঠামোর মধ্যে কীভাবে একত্রিত হয়েছে, তা পরিমাপ করে অতীতের তাপমাত্রা অনুমান করা যায়। জীবাশ্মের ক্ষেত্রে পদ্ধতিটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রাণীটি মারা যাওয়ার পর তার শরীরের তাপমাত্রা সরাসরি মাপার কোনো সুযোগ নেই।
বিশ্লেষণে টি-রেক্সের শরীরের তাপমাত্রা গড়ে ৩৬ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পাওয়া যায়। পরিমাপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনিশ্চয়তা ছিল প্রায় ২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গবেষকেরা একই ভূতাত্ত্বিক স্তর থেকে পাওয়া কুমিরজাতীয় প্রাণীর দাঁতের সঙ্গেও তুলনা করেন। তাতে টি-রেক্সের শরীরের তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল বলে দেখা যায়।
শীতল রক্তের সরীসৃপ, নাকি উষ্ণ রক্তের শিকারি?
দীর্ঘদিন ধরে ডাইনোসরদের শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। আধুনিক কুমির ও গিরগিটির মতো অনেক সরীসৃপের শরীরের তাপমাত্রা পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। তারা রোদে বসে শরীর গরম করে কিংবা ছায়া ও পানির সাহায্যে শরীর ঠান্ডা রাখে। এই ধরনের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণকে সাধারণভাবে শীতল রক্তের বৈশিষ্ট্য বলা হয়।
অন্যদিকে, মানুষ, হাতি ও পাখির মতো উষ্ণ রক্তের প্রাণী বিপাকীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শরীরের তাপ উৎপন্ন করতে পারে এবং তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল তাপমাত্রা বজায় রাখে।
নতুন গবেষণার ফলাফল থেকে ধারণা পাওয়া যায়, টি-রেক্স নিজের শরীরের তাপমাত্রা পরিবেশের চেয়ে বেশি রাখতে পারত। তবে শুধু শরীরের তাপমাত্রা বেশি হলেই কোনো প্রাণীকে পুরোপুরি উষ্ণ রক্তের বলা যায় না। শরীরের আকার, বিপাকের হার এবং পরিবেশের প্রভাবও বিবেচনা করতে হয়। এ কারণেই ডাইনোসরদের তাপ নিয়ন্ত্রণের ধরন নিয়ে গবেষণা এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
বিশাল শরীর কি তাপ ধরে রাখতে সাহায্য করত?
টি-রেক্সের শরীরের তাপমাত্রা বোঝার ক্ষেত্রে তার বিশাল দেহও গুরুত্বপূর্ণ। বড় প্রাণীর শরীর তুলনামূলক ধীরে তাপ হারায়। ফলে পরিবেশের তাপমাত্রা ওঠানামা করলেও শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা দীর্ঘ সময় স্থিতিশীল থাকতে পারে। জীববিজ্ঞানে এ ধরনের বৈশিষ্ট্যকে জড়তাজনিত তাপমাত্রা স্থিতিশীলতা বলা হয়।
তবে টি-রেক্সের ক্ষেত্রে শুধু বিশাল শরীরই তাপমাত্রা ধরে রাখার কারণ ছিল, নাকি বিপাকীয়ভাবে তাপ উৎপাদনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত, তা নির্ধারণে আরও তথ্য প্রয়োজন। নতুন গবেষণার ফলাফল দ্বিতীয় সম্ভাবনার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ যোগ করেছে।
উষ্ণ শরীর কি তাকে আরও দক্ষ শিকারি করেছিল?
টি-রেক্স ছিল ক্রিটেশিয়াস যুগের শেষভাগে উত্তর আমেরিকায় বসবাসকারী অন্যতম প্রধান শিকারি। তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল শরীরের তাপমাত্রা বজায় রাখার ক্ষমতা থাকলে দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকা, চলাফেরা এবং বিভিন্ন আবহাওয়ায় টিকে থাকার ক্ষেত্রে সুবিধা পাওয়া সম্ভব।
গবেষণায় পাওয়া তাপমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, টি-রেক্সের বিস্তৃত ভৌগোলিক অঞ্চলে বসবাসের সক্ষমতা বোঝার ক্ষেত্রেও এই তথ্য কাজে লাগতে পারে। তবে তার শিকার করার গতি, সহনশীলতা কিংবা আচরণ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে অন্যান্য জীবাশ্ম ও শারীরবৃত্তীয় প্রমাণও প্রয়োজন।
ডাইনোসরদের সব প্রজাতি কি উষ্ণ রক্তের ছিল?
টি-রেক্সের এই ফলাফল থেকে সব ডাইনোসরের শরীরের তাপমাত্রা একই রকম ছিল বলে ধরে নেওয়া যাবে না। বিভিন্ন প্রজাতির দেহের আকার, খাদ্যাভ্যাস, বাসস্থান ও বিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্য ছিল ভিন্ন। কিছু ডাইনোসরের ক্ষেত্রে বিপাকীয়ভাবে তাপ উৎপাদনের প্রমাণ পাওয়া গেলেও অন্যদের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি আলাদা হতে পারে।
আগের গবেষণাগুলোতেও ডাইনোসরের ডিমের খোসা, হাড় ও অন্যান্য জীবাশ্মের রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করে তাদের শরীরের তাপমাত্রা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেছে। এসব ফলাফল একত্রে ইঙ্গিত দেয়, ডাইনোসরদের তাপ নিয়ন্ত্রণের বিবর্তন ছিল বৈচিত্র্যময়।
নতুন গবেষণার সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হলো, জীবাশ্ম দাঁতের রাসায়নিক সংকেত ব্যবহার করে টি-রেক্সের শরীরের তাপমাত্রার একটি পরিমাপযোগ্য অনুমান পাওয়া গেছে। এর ফলে কোটি কোটি বছর আগে বিলুপ্ত প্রাণীদের জীবনযাপন সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা আরও নির্দিষ্টভাবে ধারণা করতে পারবেন। ভবিষ্যতে একই পদ্ধতি অন্য ডাইনোসরের ওপর প্রয়োগ করা গেলে প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীর প্রাণিজগত সম্পর্কে আরও নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে।
