দক্ষিণ আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়েতে একটি বড় ব্যাংকের পতন ঘিরে নজিরবিহীন রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। ব্যাংকটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগে প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনিয়াকে অভিশংসন করেছে দেশটির সিনেট। দায়িত্ব হারানোর কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাঁকে গৃহবন্দী করা হয়। ব্যাংকটির ধসে বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের সঞ্চয় ও লেনদেন আটকে যাওয়ার পর দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সেই ক্ষোভের চাপ, ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ মিলেই শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের পতন ঘটিয়েছে।
শুক্রবার সিনেটে অভিশংসন প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন ৪৪ জন সদস্য। ৪৫ সদস্যের সিনেটে একজন অনুপস্থিত ছিলেন। ভোটের পর সিনেটের সভাপতি বাসিলিও নুনিয়েস পেনিয়াকে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার দায়ে দোষী ঘোষণা করেন। এরপর ভাইস প্রেসিডেন্ট পেদ্রো আলিয়ানা নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। তিনি ২০২৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত মেয়াদের বাকি সময় দায়িত্ব পালন করবেন।
কীভাবে শুরু হলো সংকট
প্যারাগুয়ের আর্থিক খাতের পরিচিত প্রতিষ্ঠান উয়েনো ব্যাংকের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সংকটের সূত্রপাত। ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার অবনতি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তক্ষেপের ফলে গ্রাহকেরা নিজেদের হিসাবে থাকা অর্থ তুলতে ও স্বাভাবিক লেনদেন করতে সমস্যায় পড়েন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ সঞ্চয়কারী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকেরা।
ব্যাংকটির পতনের প্রভাব ছিল ব্যাপক। এক মিলিয়নের বেশি মানুষ সরাসরি আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অনেকের কাছে ব্যাংকে রাখা অর্থ ছিল পরিবারের সঞ্চয়, ব্যবসার মূলধন কিংবা অবসরজীবনের নিরাপত্তা। হঠাৎ সেই অর্থে প্রবেশাধিকার হারিয়ে তাঁরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
ব্যাংকটির কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পর আমানতকারীরা রাজপথে বিক্ষোভ শুরু করেন। তাঁদের দাবি ছিল, শুধু ব্যাংকের কর্মকর্তা নয়, প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সম্পর্ক থাকা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ কী
পেনিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি নিজের সরকারি পদ ও প্রভাব ব্যবহার করে উয়েনো ব্যাংকের সুবিধা নিশ্চিত করেছিলেন। আইনপ্রণেতাদের দাবি, তাঁর সরকারের সময়ে সরকারি অর্থের একটি অংশ ব্যাংকটিতে জমা রাখা হয়। একই সময়ে ব্যাংকটির ভেতরে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সুবিধা দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ড চললেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি।
অভিযোগকারীদের মতে, ব্যাংকটির সঙ্গে পেনিয়ার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থের সম্পর্ক ছিল। সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় তাঁর ভূমিকা এবং ব্যাংকটির আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে তিনি কতটা জানতেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই তাঁর বিরুদ্ধে আস্থার অপব্যবহার, প্রভাব খাটানো এবং সরকারি পদ ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে।
পেনিয়া অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত এখনো চলমান; আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। ফলে অভিশংসনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং ফৌজদারি মামলার বিচারিক নিষ্পত্তি—দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি।
নতুন প্রেসিডেন্টের সামনে অর্থ ফেরানোর চ্যালেঞ্জ
পেনিয়ার বিদায়ের পর দায়িত্ব নেওয়া পেদ্রো আলিয়ানা প্রথম বক্তব্যেই ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের অর্থ ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ব্যাংক ধসের কারণে বিপাকে পড়া মানুষকে সরকার একা ছেড়ে দেবে না।
তবে অর্থ ফেরানোর প্রক্রিয়া সহজ নয়। ব্যাংকটির সম্পদ, দায়, ঋণ এবং গ্রাহকদের আমানতের হিসাব যাচাই করে ধাপে ধাপে অর্থ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, আমানত বিমার আওতায় গ্রাহকদের বড় একটি অংশ সুরক্ষা পাওয়ার কথা। তবে বিমার আওতা, অর্থ ফেরতের সময় এবং যাঁদের আমানত নির্ধারিত সীমার বেশি—তাঁদের ক্ষতিপূরণ কীভাবে দেওয়া হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ব্যাংকটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২৭ জন নির্বাহীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে সম্পর্কিত সম্পদ জব্দের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে ব্যাংক ধসের প্রকৃত কারণ এবং কারা এর জন্য দায়ী, তা বের করার চেষ্টা চলছে।
ক্ষমতাসীন দলের ভেতরেও বিভাজন
পেনিয়ার অভিশংসন শুধু ব্যাংক সংকটের ফল নয়; ক্ষমতাসীন কলোরাডো পার্টির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও এতে ভূমিকা রেখেছে। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠপোষক ও সাবেক প্রেসিডেন্ট হোরাসিও কার্তেসের সমর্থন সরে যাওয়ায় পেনিয়া আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। দলের ভেতরের বিরোধীরা তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেন।
নতুন প্রেসিডেন্ট আলিয়ানাও তদন্তের বাইরে নন। তাঁর বিরুদ্ধেও তদন্ত চলছে বলে জানা গেছে। ফলে ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি। নতুন সরকারকে একদিকে ব্যাংক ধসের দায় নির্ধারণ করতে হবে, অন্যদিকে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত ও আর্থিক খাতের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হবে।
আর্থিক বিপর্যয় থেকে রাজনৈতিক পতন
প্যারাগুয়ের সাম্প্রতিক ঘটনা দেখিয়েছে, একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পতন কীভাবে পুরো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামোকে নাড়িয়ে দিতে পারে। ব্যাংকের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সংকট দ্রুত রাজনৈতিক রূপ নেয়।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তদন্তের স্বচ্ছতা, ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ ফেরত এবং আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার জবাবদিহি। নতুন সরকার যদি এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে না পারে, তাহলে পেনিয়ার বিদায়ের পরও জনঅসন্তোষ কমবে না। বরং ব্যাংক ধসের ক্ষত প্যারাগুয়ের রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
