প্রায় দুই হাজার বছর ধরে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে পুড়ে কয়লা হয়ে থাকা প্রাচীন পাণ্ডুলিপির ভেতরের লেখা উদ্ধার করে ইতিহাস গবেষণায় নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং অত্যাধুনিক এক্স-রে প্রযুক্তির সাহায্যে পাণ্ডুলিপিগুলো না খুলেই সেগুলোর ভেতরে লুকিয়ে থাকা অক্ষর শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে প্রাচীন গ্রিক ও রোমান জ্ঞানচর্চা, দর্শন এবং সাহিত্য সম্পর্কে নতুন তথ্য জানার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ইতালির প্রাচীন নগরী হারকিউলেনিয়ামের একটি রোমান ভিলায় পাওয়া এসব পাণ্ডুলিপি বহু শতাব্দী ধরে গবেষকদের কাছে ছিল দুর্বোধ্য। আগুন ও প্রচণ্ড তাপে সেগুলো এমনভাবে পুড়ে গিয়েছিল যে হাতে খুলে পড়ার চেষ্টা করলে ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি সেই অসম্ভবকে সম্ভব করার পথ দেখাচ্ছে।
আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের নিচে হারিয়ে যাওয়া জ্ঞানভাণ্ডার
খ্রিস্টাব্দ ৭৯ সালে ইতালির মাউন্ট ভিসুভিয়াসে ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাত ঘটে। এর ফলে পম্পেই ও হারকিউলেনিয়ামসহ আশপাশের কয়েকটি জনপদ আগ্নেয় ছাই, উত্তপ্ত গ্যাস ও ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে যায়। বিপর্যয়ে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি ধ্বংস হয় ঘরবাড়ি, শিল্পকর্ম ও মূল্যবান ঐতিহাসিক নিদর্শন।
হারকিউলেনিয়ামের একটি বিলাসবহুল রোমান ভিলায় পাওয়া যায় বিপুলসংখ্যক প্যাপিরাসের পাণ্ডুলিপি। গবেষকদের ধারণা, ভিলাটি একসময় গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র ছিল। সেখানে সংরক্ষিত স্ক্রোলগুলোতে দর্শন ও অন্যান্য বিষয়ে লেখা ছিল বলে মনে করা হয়।
অগ্ন্যুৎপাতের প্রচণ্ড তাপে পাণ্ডুলিপিগুলো পুড়ে কালো হয়ে যায়। তবে আগ্নেয় পদার্থের নিচে চাপা পড়ায় সেগুলোর কিছু অংশ টিকে যায়। পরে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা এগুলো উদ্ধার করলেও অধিকাংশ পাণ্ডুলিপির লেখা পড়া কঠিন হয়ে পড়ে। কিছু স্ক্রোল খুলতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বাকি পাণ্ডুলিপিগুলো অক্ষত রেখে পড়ার বিকল্প পদ্ধতি খুঁজতে থাকেন গবেষকেরা।
পাণ্ডুলিপি না খুলেই লেখা পড়ার প্রযুক্তি
এই সমস্যার সমাধানে ব্যবহার করা হচ্ছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এক্স-রে ইমেজিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এক্স-রে প্রযুক্তির মাধ্যমে স্ক্রোলের ভেতরের স্তরগুলোর ত্রিমাত্রিক ছবি তৈরি করা হয়। এরপর কম্পিউটারভিত্তিক অ্যালগরিদম সেই ছবিতে কালি ও প্যাপিরাসের সূক্ষ্ম পার্থক্য শনাক্ত করার চেষ্টা করে।
সাধারণ অবস্থায় পোড়া পাণ্ডুলিপির কালির সঙ্গে আশপাশের উপাদানের পার্থক্য খুব সামান্য হওয়ায় লেখা আলাদা করে চেনা কঠিন। বিশেষ করে প্রাচীন রোমান পাণ্ডুলিপিতে ব্যবহৃত কার্বনভিত্তিক কালি প্যাপিরাসের সঙ্গে প্রায় একই রকম সংকেত দিতে পারে। এ কারণে শুধু স্ক্যান করলেই সব লেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে না।
এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দিয়ে স্ক্রোলের ভাঁজ, স্তর এবং লেখার সম্ভাব্য চিহ্ন শনাক্ত করা হয়। ডিজিটালভাবে স্তরগুলো আলাদা করে সমতল পৃষ্ঠের মতো সাজানোর পর বিশেষজ্ঞরা অক্ষর ও শব্দ শনাক্ত করতে পারেন। এই পদ্ধতিতে পাণ্ডুলিপিকে শারীরিকভাবে খুলতে হয় না, ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও কমে।
ভিসুভিয়াস চ্যালেঞ্জে নতুন সাফল্য
এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত আন্তর্জাতিক উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে ‘ভিসুভিয়াস চ্যালেঞ্জ’। এর লক্ষ্য উন্নত ইমেজিং, মেশিন লার্নিং ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের সাহায্যে হারকিউলেনিয়ামের পাণ্ডুলিপিগুলো পাঠযোগ্য করে তোলা।
২০২৩ সালে এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত গবেষকেরা একটি স্ক্রোলের ভেতর থেকে গ্রিক অক্ষর শনাক্ত করতে সক্ষম হন। পরবর্তী সময়ে আরও উন্নত পদ্ধতি ব্যবহার করে পাণ্ডুলিপির অংশবিশেষ থেকে শব্দ ও বাক্য উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এসব অগ্রগতি দেখিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে অদৃশ্য থাকা প্রাচীন লেখাগুলো ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে পাঠযোগ্য করে তোলা বাস্তবসম্মত।
তবে সব পাণ্ডুলিপি পুরোপুরি পড়া হয়ে গেছে, এমন নয়। অনেক স্ক্রোলের লেখা এখনো আংশিকভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অক্ষর স্পষ্ট হলেও সেগুলো থেকে সম্পূর্ণ বাক্য বা লেখকের বক্তব্য নির্ধারণ করতে আরও বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
প্রাচীন গ্রিক ও রোমান দর্শনের নতুন অধ্যায়
হারকিউলেনিয়ামের পাণ্ডুলিপিগুলোর বড় অংশের সঙ্গে এপিকিউরীয় দর্শনের সম্পর্ক রয়েছে বলে গবেষকেরা মনে করেন। এই দর্শনধারায় সুখ, ভয়, প্রকৃতি, জ্ঞান এবং মানুষের জীবন সম্পর্কে আলোচনা করা হতো। বিশেষ করে প্রাচীন দার্শনিক ফিলোদেমাসের রচনার সঙ্গে এসব পাণ্ডুলিপির সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
পোড়া স্ক্রোলগুলোর ভেতরে আরও কী লেখা রয়েছে, তা জানা গেলে প্রাচীন চিন্তাবিদদের মতামত, তর্ক-বিতর্ক এবং হারিয়ে যাওয়া গ্রন্থ সম্পর্কে ধারণা বদলে যেতে পারে। বর্তমানে পরিচিত প্রাচীন লেখাগুলোর অনেক কিছুই এসেছে পরবর্তী যুগের অনুলিপি বা উদ্ধৃতি থেকে। নতুন পাণ্ডুলিপি পাঠযোগ্য হলে সেই জ্ঞানভাণ্ডারের শূন্যস্থান পূরণ করা সম্ভব হতে পারে।
এ ছাড়া প্রাচীন রোমে বই সংরক্ষণ, ব্যক্তিগত লাইব্রেরির ভূমিকা এবং দার্শনিকদের মধ্যে জ্ঞান বিনিময়ের ধরন সম্পর্কেও নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে। ফলে আবিষ্কারটি শুধু সাহিত্য বা দর্শনের ইতিহাসেই নয়, প্রাচীন সমাজের সাংস্কৃতিক ইতিহাস গবেষণাতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রযুক্তির সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—মূল নিদর্শন স্পর্শ না করেই তার ভেতরের তথ্য উদ্ধার করা। একই ধরনের পদ্ধতি ভবিষ্যতে ক্ষতিগ্রস্ত চিঠি, প্রাচীন দলিল কিংবা অন্য দুর্বল ঐতিহাসিক নিদর্শন পাঠোদ্ধারেও কাজে লাগতে পারে।
তবে এআইয়ের শনাক্ত করা প্রতিটি অক্ষর বা শব্দকে নির্ভুল ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। স্ক্যানের মান, পাণ্ডুলিপির অবস্থা এবং অ্যালগরিদমের সীমাবদ্ধতার কারণে ভুল শনাক্তকরণ ঘটতে পারে। তাই উদ্ধার করা লেখা যাচাই করতে হয় ভাষাবিদ, ইতিহাসবিদ ও প্রাচীন গ্রিক ভাষার বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে।
দুই হাজার বছর আগে আগুনে পুড়ে যাওয়া পাণ্ডুলিপি আজ আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে কথা বলতে শুরু করেছে। প্রতিটি নতুন অক্ষর ও শব্দ প্রাচীন বিশ্বের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের আরেকটি দরজা খুলে দিতে পারে। বিজ্ঞানীদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এই প্রযুক্তিকে আরও নির্ভুল করে যত বেশি সম্ভব পাণ্ডুলিপি পাঠযোগ্য করে তোলা।
