তানজানিয়ার প্রধান বিরোধী দল চাদেমার নেতা টুন্ডু লিসুকে চার বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির আদালত। ২০২৫ সালের সাধারণ নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে জনসাধারণকে উসকানি দেওয়ার অভিযোগে তাঁকে এই সাজা দেওয়া হয়েছে। তবে একই মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে আনা রাষ্ট্রদ্রোহের গুরুতর অভিযোগ থেকে তাঁকে অব্যাহতি দিয়েছেন বিচারকেরা। দীর্ঘ ১৯ মাস কারাগারে থাকার পর এই রায় দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। লিসু ও তাঁর দল একে রাজনৈতিক নিপীড়ন হিসেবে দেখছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
শুক্রবার দারুস সালামের উচ্চ আদালতের তিন বিচারকের একটি প্যানেল এই রায় দেন। বিচারকেরা বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। তবে লিসুর বক্তব্যে নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করার জন্য মানুষকে উসকানি দেওয়ার উপাদান পাওয়া গেছে। সেই কারণে তুলনামূলক কম গুরুতর অপরাধে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি, তবু কারাগারে
লিসুর বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ ছিল রাষ্ট্রদ্রোহ। এই অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁর মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারত। ২০২৫ সালের ৩ এপ্রিল দারুস সালামে চাদেমার সদর দপ্তরে দেওয়া এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে মামলাটি করা হয়। অভিযোগে বলা হয়েছিল, তিনি সমর্থকদের নির্বাচন ঠেকাতে এবং বিদ্রোহে অংশ নিতে উৎসাহিত করেছিলেন।
লিসু অবশ্য শুরু থেকেই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, নির্বাচনী সংস্কারের দাবিতে দেওয়া রাজনৈতিক বক্তব্যকে অপরাধ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু না হলে বিরোধী দলগুলোর ভোট বর্জন ও প্রতিবাদের অধিকার রয়েছে।
আদালত রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ থেকে তাঁকে অব্যাহতি দিলেও উসকানির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেছে। বিচারকদের মতে, তাঁর বক্তব্যের প্রভাবে কিছু মানুষ নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করার কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছিলেন বলে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীরা জানিয়েছেন। এই যুক্তিতে তাঁকে চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
যে বক্তব্য ঘিরে মামলা
লিসুর বিরুদ্ধে মামলার সূত্রপাত ২০২৫ সালের নির্বাচনের আগে দেওয়া একটি বক্তব্য থেকে। সে সময় তিনি নির্বাচনী ব্যবস্থায় সংস্কার, বিরোধী দলের অংশগ্রহণের সুযোগ এবং ভোটের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাঁর বক্তব্যের একটি অংশকে সরকার নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করার আহ্বান হিসেবে ব্যাখ্যা করে।
চাদেমা দীর্ঘদিন ধরে তানজানিয়ার নির্বাচনী ব্যবস্থায় পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আসছে। দলটির অভিযোগ, ক্ষমতাসীন দল চামা চা মাপিন্দুজি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে। বিরোধী প্রার্থীদের প্রচার, সমাবেশ এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও বাধা দেওয়া হয় বলে দলটির নেতারা দাবি করেন।
লিসুর গ্রেপ্তারের পর চাদেমার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও কঠিন হয়ে পড়ে। ২০২৫ সালের নির্বাচনে দলটিকে অংশ নিতে না দেওয়ার ঘটনাও বিরোধী রাজনীতিতে উত্তেজনা বাড়ায়। লিসুর গ্রেপ্তার, সরকারবিরোধী সমালোচকদের অপহরণের অভিযোগ এবং নির্বাচনে বিরোধীদের অংশগ্রহণে বাধা—সব মিলিয়ে দেশটিতে বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল।
নির্বাচন ঘিরে প্রাণঘাতী সহিংসতা
২০২৫ সালের অক্টোবরের নির্বাচনের সময় তানজানিয়ার বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে বহু মানুষ নিহত হন। দেশটির প্রেসিডেন্ট সামিয়া সুলুহু হাসানের গঠিত একটি তদন্ত কমিশন জানিয়েছিল, সহিংসতায় অন্তত ৫১৮ জন নিহত হয়েছেন। তবে কমিশন এই প্রাণহানির দায় বিক্ষোভকারীদের ওপর চাপায়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ ছিল, নিরাপত্তা বাহিনী অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছে এবং নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে। সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট সামিয়া সুলুহু হাসান ৯৭ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হন। তবে প্রধান বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণ সীমিত থাকায় ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা তানজানিয়ার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
লিসুর দল ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিক্রিয়া
রায়ের পর লিসু আদালতকক্ষে বিচারকদের সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক নিপীড়ন বলে আখ্যা দেন। তাঁর অভিযোগ, সরকার তাঁকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে রাখতে বিচারব্যবহার করছে। তিনি বলেন, যে অভিযোগে তাঁকে বিচার করা হয়েছে, সেই অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করার মাধ্যমে তাঁকে কারাগারে রাখার পথ তৈরি করা হয়েছে।
চাদেমার নেতারা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ প্রমাণ করতে না পেরে আদালত বিকল্প অভিযোগে সাজা দিয়েছে। তাঁরা লিসুর মুক্তি দাবি করেছেন।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের বক্তব্য, রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণে বিরোধী নেতাকে দীর্ঘ সময় আটক রাখা এবং পরে কারাদণ্ড দেওয়া মতপ্রকাশ ও রাজনৈতিক অধিকারকে সংকুচিত করতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ব্রিটিশ আইনপ্রণেতারাও মামলাটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে সমালোচনা করেছেন।
আফ্রিকায় বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে মামলার প্রবণতা
লিসুর ঘটনা আফ্রিকার কয়েকটি দেশে বিরোধী নেতা ও সরকারসমালোচকদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ বা অনুরূপ অভিযোগে মামলা করার বৃহত্তর প্রবণতার সঙ্গে মিল রয়েছে। বিভিন্ন দেশে সরকারবিরোধী বক্তব্য, নির্বাচন বর্জনের আহ্বান কিংবা বিক্ষোভে অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ আনা হচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এ ধরনের মামলা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র সংকুচিত করতে পারে।
তবে তানজানিয়ার সরকার বলছে, দেশের স্থিতিশীলতা ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সরকারবিরোধী বক্তব্যের নামে সহিংসতা বা আইন ভাঙার আহ্বান গ্রহণযোগ্য নয়—এমন যুক্তিও তুলে ধরা হয়েছে।
আপিলের পথে লিসু, রাজনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত
চার বছরের সাজা হলেও লিসুর সামনে আপিলের সুযোগ রয়েছে। তাঁর আইনজীবীরা জানিয়েছেন, তাঁরা রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে আপিলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে কারাগারেই থাকতে হবে।
তানজানিয়ার রাজনীতিতে এই রায়ের প্রভাব কতটা পড়বে, তা নির্ভর করছে সরকার বিরোধীদের সঙ্গে আলোচনায় বসে কি না এবং নির্বাচনী সংস্কারের দাবিতে কী পদক্ষেপ নেয় তার ওপর। বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যৎ নির্বাচনও বিতর্কের মুখে পড়তে পারে।
লিসুর কারাদণ্ড তাই শুধু একজন বিরোধী নেতার আইনি পরিণতি নয়; এটি তানজানিয়ায় রাজনৈতিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে চলমান বিতর্কেরও প্রতিফলন।
