জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব কে হচ্ছেন—আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এটি। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা। ফলে নতুন মহাসচিব নির্বাচন নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব, বড় শক্তিগুলোর সমর্থন, আন্তর্জাতিক সংঘাত মোকাবিলার দক্ষতা এবং জাতিসংঘের সংস্কার—সবকিছুই সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব শুধু বিশ্বের বৃহত্তম বহুপক্ষীয় সংস্থার প্রশাসনিক প্রধান নন; তিনি আন্তর্জাতিক সংকটে মধ্যস্থতাকারী, কূটনৈতিক আলোচনার সমন্বয়কারী এবং বিশ্বজনমতের কাছে সংস্থাটির অন্যতম প্রধান মুখ। তাই নতুন মহাসচিব নির্বাচনের প্রশ্নটি কেবল একটি পদে নিয়োগের বিষয় নয়, বরং আগামী বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক কূটনীতি কোন পথে এগোবে, তারও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
আলোচনার কেন্দ্রে সাত প্রার্থী
জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব হওয়ার দৌড়ে বর্তমানে সাতজন প্রার্থী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিক এবং সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তারা।
ঘের পরবর্তী মহাসচিব হওয়ার দৌড়ে বর্তমানে সাতজন প্রার্থী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিক এবং সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তারা।

রেবেকা গ্রিনস্প্যান — কোস্টারিকা
অর্থনীতিবিদ ও জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার প্রধান
লাতিন আমেরিকার এই প্রার্থী অনানুষ্ঠানিক ভোটে বেশ কয়েকবার এগিয়ে ছিলেন। উন্নয়ন, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা তাঁকে আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছে।
রাফায়েল গ্রোসি — আর্জেন্টিনা
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক
পারমাণবিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে। সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে আলোচনা চালানো এবং সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক ইস্যু সামলানোর দক্ষতা তাঁর বড় শক্তি।
ক্যারোলিন রদ্রিগেস বার্কেট — গায়ানা
জাতিসংঘে গায়ানার রাষ্ট্রদূত
বহুপক্ষীয় কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক আলোচনায় তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর প্রার্থিতা গুরুত্ব পাচ্ছে।
মারিয়া ফের্নান্দা এস্পিনোসা — ইকুয়েডর
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাবেক সভাপতি
আন্তর্জাতিক কূটনীতি, পরিবেশ এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতায় তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্রম সম্পর্কে তাঁর ধারণা প্রার্থিতার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ইভোনে আ-বাকি — ইকুয়েডর
কূটনীতিক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আলোচনার ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে। তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হলেও তিনি আনুষ্ঠানিক প্রার্থীদের একজন।
ওলারা ওতুনু — উগান্ডা
জাতিসংঘের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও সংঘাত মোকাবিলার বিষয়ে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। আফ্রিকা থেকে নেতৃত্ব আসার সম্ভাবনার আলোচনায় তাঁর নাম রয়েছে।
লানা নুসেইবেহ — সংযুক্ত আরব আমিরাত
পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও সাবেক জাতিসংঘ রাষ্ট্রদূত
দীর্ঘদিন জাতিসংঘে আমিরাতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। ২১ অক্টোবর তাঁর প্রার্থিতা সামনে আসায় প্রতিযোগিতায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
কেন এখনো নিশ্চিত নয় কোনো নাম?
অনানুষ্ঠানিক ভোটে গ্রিনস্প্যান এগিয়ে থাকলেও সর্বশেষ দফায় সাত প্রার্থীর প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই অন্তত একজন স্থায়ী সদস্যের নিরুৎসাহিত করার ভোট পড়েছে বলে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়। অর্থাৎ, কোনো প্রার্থীর পথই এখনো পুরোপুরি মসৃণ নয়। পাঁচ স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, রাশিয়া ও ফ্রান্সের মধ্যে কোনো একটির ভেটোও একজন প্রার্থীর নিয়োগ আটকে দিতে পারে।
নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের মধ্যে অন্তত নয়টি ভোট পেতে হবে প্রার্থীকে, পাশাপাশি স্থায়ী সদস্যদের কারও ভেটো থাকা চলবে না। এরপর সাধারণ পরিষদের ১৯৩ সদস্যের সামনে নিয়োগের প্রস্তাব যাবে। ফলে শুধু জনপ্রিয়তা বা অভিজ্ঞতা নয়, বড় শক্তিগুলোর মধ্যে গ্রহণযোগ্যতাও চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করবে।
নারী মহাসচিবের সম্ভাবনা কি এবার বাড়বে?
জাতিসংঘের আট দশকের বেশি ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো নারী মহাসচিব হননি। এবারের প্রতিযোগিতায় একাধিক নারী প্রার্থী থাকায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে নারী প্রার্থী হওয়া নিজে থেকেই নির্বাচনের নিশ্চয়তা দেয় না। আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্ব, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং স্থায়ী সদস্যদের সমর্থনই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে প্রার্থী বাছাইয়ের সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। তবে জাতিসংঘের সনদে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে মহাসচিব নিয়োগের বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে ভৌগোলিক ভারসাম্য একটি রাজনৈতিক বিবেচনা হলেও তা চূড়ান্ত নিয়ম নয়।
কবে জানা যাবে পরবর্তী মহাসচিবের নাম?
আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নিরাপত্তা পরিষদকে প্রার্থী নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। নতুন মহাসচিবের দায়িত্ব গ্রহণের নির্ধারিত তারিখ ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি। হাতে সময় কমে আসায় কূটনৈতিক আলোচনা আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নতুন মহাসচিবকে যুদ্ধ, মানবিক সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, শরণার্থী সমস্যা এবং জাতিসংঘের আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মতো কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। তাই প্রশ্নটি শুধু কে নির্বাচিত হবেন, তা নয়; বরং বিভক্ত বিশ্বে কোন প্রার্থী বিভিন্ন দেশের আস্থা অর্জন করে জাতিসংঘকে কার্যকরভাবে নেতৃত্ব দিতে পারবেন।
আপাতত গ্রিনস্প্যান আলোচনায় এগিয়ে থাকলেও তাঁকে নিশ্চিত বিজয়ী বলা যাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে নিরাপত্তা পরিষদের সমঝোতা এবং বড় শক্তিগুলোর অবস্থানের ওপর।
