ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে কুকি-জো ও নাগা সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক সংঘর্ষে দুই দিনে সাতজন নিহত হওয়ার খবর সামনে এসেছে। পাহাড়ি জেলাগুলোতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার পাশাপাশি রাজ্যের দীর্ঘস্থায়ী জাতিগত সংকটও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০২৩ সালে মেইতেই ও কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যে শুরু হওয়া সংঘাতের পাশাপাশি এখন কুকি-নাগা উত্তেজনাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
নতুন সহিংসতার ঘটনা
মণিপুরের পাহাড়ি এলাকায় সাম্প্রতিক কয়েকটি হামলা ও পাল্টা হামলার পর প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে সেনাপতি জেলায় দুই নাগা বেসামরিক নাগরিককে গুলি করে হত্যার ঘটনা সামনে আসে। এর আগে আগস্টের শেষ দিকে নাগা ও কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত সাতজন নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছিল মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে কুকি-জো ও নাগা সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ৩৪ জন নিহত হয়েছেন। এর আগে মেইতেই ও কুকি-জো সম্প্রদায়ের সংঘাতে ২০২৩ সাল থেকে ২৬০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু এবং ৬০ হাজারের বেশি মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
কেন বাড়ছে কুকি-নাগা উত্তেজনা
মণিপুরের জাতিগত সংঘাতের পেছনে ভূমি, পরিচয়, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। কুকি-জো ও নাগা—দুই সম্প্রদায়েরই নিজস্ব ঐতিহাসিক পরিচয়, সামাজিক সংগঠন এবং রাজনৈতিক দাবি রয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস, স্থানীয় কর্তৃত্ব এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে আস্থার সংকট পরিস্থিতিকে সংবেদনশীল করে তুলেছে।
মণিপুরে মেইতেই ও কুকি-জো সংঘাতের পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি বদলে যায়। বিভিন্ন এলাকায় চলাচল, পণ্য সরবরাহ এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন সমস্যা তৈরি হয়। এক সম্প্রদায়ের অবরোধের জবাবে অন্য সম্প্রদায়ের পাল্টা অবরোধের ঘটনাও ঘটেছে। এতে পাহাড়ি জেলাগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হয়।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে স্থানীয় বিরোধ দ্রুত বৃহত্তর জাতিগত উত্তেজনায় রূপ নিতে পারে। কোনো হামলার পর প্রতিশোধমূলক সহিংসতার আশঙ্কা তৈরি হলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
অবরোধ ও যোগাযোগের সংকট
মণিপুরের পাহাড়ি এলাকায় সড়ক যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্য, জ্বালানি, ওষুধ এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনের জন্য কয়েকটি প্রধান সড়কের ওপর নির্ভর করতে হয়। অবরোধ বা সংঘর্ষের কারণে এসব পথে চলাচল ব্যাহত হলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব পড়ে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাগা গোষ্ঠীর অবরোধের কারণে কাংপোকপি জেলার কুকি-জো অধ্যুষিত এলাকায় পণ্য সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। পরে উখরুলের দিকে পণ্য পরিবহন সীমিত করতে কুকি-জো গোষ্ঠীর পাল্টা অবরোধের ঘটনাও ঘটে। রাজ্য সরকারের হস্তক্ষেপের পর কিছু অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়।
নিরাপত্তা ও প্রশাসনের চ্যালেঞ্জ
সহিংসতা ঠেকাতে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো হলেও পাহাড়ি অঞ্চলের বিচ্ছিন্ন বসতি, দুর্গম পথ এবং স্থানীয় অবিশ্বাসের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন। হামলার ঘটনায় কারা জড়িত, কী উদ্দেশ্যে হামলা হয়েছে এবং কীভাবে প্রতিশোধমূলক সহিংসতা ঠেকানো যায়—এসব প্রশ্নে তদন্ত ও নিরপেক্ষ তথ্য সংগ্রহ জরুরি।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো সহিংসতার তদন্ত, দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে আলোচনা ও আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।
সমাধানের পথ কতটা কঠিন
মণিপুরের সংকট কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়। এর সঙ্গে ভূমি, পরিচয়, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং নিরাপত্তার মতো গভীর প্রশ্ন জড়িত। তাই শুধু নিরাপত্তা অভিযান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। স্থানীয় নেতৃত্ব, সম্প্রদায়ভিত্তিক সংগঠন, রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের মধ্যে ধারাবাহিক সংলাপ প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক প্রাণহানি পরিস্থিতির ভঙ্গুরতা আবারও তুলে ধরেছে। নতুন সহিংসতা ঠেকাতে দ্রুত তদন্ত, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এবং সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে যোগাযোগ পুনরুদ্ধার এখন সবচেয়ে জরুরি চ্যালেঞ্জ।
