প্রায় পাঁচ দশক ধরে আটকে থাকা একটি আইনি প্রক্রিয়ায় নতুন মোড় এসেছে নেপালে। ঔষধি, বৈজ্ঞানিক, কৃষি ও শিল্প খাতে ব্যবহারের জন্য নিয়ন্ত্রিতভাবে গাঁজা চাষের ব্যবস্থা করতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের এই আদেশে লাইসেন্স ও কঠোর নজরদারির আওতায় বাণিজ্যিক উৎপাদনের পথ তৈরি হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে নেপালে অবাধে গাঁজা চাষ বা বিনোদনমূলক ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় বিধিমালা, মানদণ্ড ও কার্যপদ্ধতি প্রণয়নের জন্য সরকারকে তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছে। গাঁজা চাষ, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, ব্যবহার, বিক্রি, বিতরণ এবং আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে অনুমতিপত্র ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
কী বলেছে সুপ্রিম কোর্ট
নেপালের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নাহাকুল সুবেদি ও তিল প্রসাদ শ্রেষ্ঠের যৌথ বেঞ্চ ২০২৫ সালের ১৮ মে এ বিষয়ে রায় দিয়েছিলেন। তবে রায়ের পূর্ণাঙ্গ পাঠ সম্প্রতি প্রকাশিত হওয়ায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
আইনজীবী সরোজ অধিকারী ও সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীদের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এই নির্দেশ দেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ, ১৯৭৬ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে নির্দিষ্ট শর্তে গাঁজা চাষ ও ব্যবহারের ব্যবস্থা করার সুযোগ থাকলেও সরকার দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় বিধিমালা তৈরি করেনি। ফলে আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।
আদালত সরকারকে এমন একটি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তুলতে বলেছে, যাতে অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে গাঁজা উৎপাদন করতে পারেন। একই সঙ্গে অনুমতি ছাড়া চাষ, উৎপাদন, মজুত ও বিপণন ঠেকাতে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
কেন প্রায় ৫০ বছর পর এই উদ্যোগ
নেপালে একসময় গাঁজা চাষ ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত একটি বৈধ অর্থনৈতিক পরিসর ছিল। তবে ১৯৭০-এর দশকে আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী চাপের প্রেক্ষাপটে দেশটি গাঁজা বিক্রেতাদের লাইসেন্স বাতিল করে এবং নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করে। ১৯৭৬ সালে প্রণীত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে কিছু নির্দিষ্ট ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিধিমালা দীর্ঘদিন তৈরি হয়নি।
আদালতের মতে, আইন কার্যকর করার দায়িত্ব সরকারের। আইনেই যখন নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে, তখন প্রয়োজনীয় বিধি না বানিয়ে সেই সুযোগ অকার্যকর করে রাখা রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার শামিল।
এই আইনি ব্যাখ্যার ফলে সরকার এখন ঔষধি ও শিল্প খাতে গাঁজার সম্ভাবনা কাজে লাগানোর জন্য একটি কাঠামো তৈরির বাধ্যবাধকতার মুখে পড়েছে।
ঔষধ ও শিল্পে সম্ভাবনা
নিয়ন্ত্রিত গাঁজা চাষের পক্ষে সমর্থকদের যুক্তি, উদ্ভিদটির ব্যবহার শুধু মাদক হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। নির্দিষ্ট উপাদান থেকে ওষুধ তৈরির গবেষণা, চিকিৎসায় প্রয়োগ এবং শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে এর সম্ভাবনা রয়েছে। গাঁজার আঁশ দিয়ে বস্ত্র, কাগজ, দড়ি ও বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব। বীজ ও অন্যান্য অংশ থেকেও শিল্পে ব্যবহারের উপযোগী উপাদান পাওয়া যায়।
নেপালের মতো কৃষিনির্ভর দেশে নিয়ন্ত্রিত উৎপাদন চালু হলে কৃষক, প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান এবং ওষুধশিল্পের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য মান নিয়ন্ত্রণ, গবেষণা, বাজারব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ মেনে চলার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিনোদনমূলক ব্যবহারে অনুমতি নয়
আদালতের রায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখাটি হলো, বিনোদনমূলক ব্যবহারের প্রশ্নে কোনো চূড়ান্ত বৈধতা দেওয়া হয়নি। বিচারপতিরা বলেছেন, বিষয়টি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের সঙ্গে জড়িত। তাই এ বিষয়ে আইন পরিবর্তনের আগে বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা প্রয়োজন।
অর্থাৎ, ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য অবাধে গাঁজা চাষ, বিক্রি বা সেবনের অনুমতি এই রায়ের মাধ্যমে কার্যকর হচ্ছে না। বরং নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে লাইসেন্সের ভিত্তিতে নিয়ন্ত্রিত উৎপাদনের ব্যবস্থা করতে সরকারকে বলা হয়েছে। অনুমোদনহীন চাষ ও মাদক পাচারের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইনি ব্যবস্থা বহাল থাকবে।
সরকারের সামনে বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নে সরকারকে প্রথমে লাইসেন্স দেওয়ার নিয়ম, উৎপাদনের সীমা, মান যাচাই, সংরক্ষণ ও পরিবহনের শর্ত নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে বৈধ উৎপাদনের আড়ালে অবৈধ বাজার বিস্তার ঠেকাতে নজরদারি জোরদার করতে হবে।
আন্তর্জাতিক মাদক নিয়ন্ত্রণ চুক্তির বাধ্যবাধকতাও বিবেচনায় রাখতে হবে। বিশেষ করে ১৯৬১ সালের মাদকদ্রব্যবিষয়ক একক কনভেনশনের বিধান অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত উৎপাদন ও তদারকির কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।
নেপালের সুপ্রিম কোর্টের রায় তাই একদিকে কৃষি, চিকিৎসা ও শিল্প খাতে সম্ভাবনার দরজা খুলেছে, অন্যদিকে সরকারকে কঠোর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরির দায়িত্ব দিয়েছে। পাঁচ দশকের আইনি স্থবিরতা কাটানোর সুযোগ তৈরি হলেও এর বাস্তব সুফল নির্ভর করবে সরকার কতটা স্বচ্ছ, কার্যকর ও দায়িত্বশীলভাবে নতুন বিধিমালা বাস্তবায়ন করতে পারে তার ওপর।
