যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয় পাকিস্তানের রাজনীতিতে নতুন হিসাব-নিকাশ তৈরি করেছে। ওয়াশিংটনের ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তনের এই ইঙ্গিতকে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব দেখছে সম্ভাব্য কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে। অন্যদিকে দেশটির সাধারণ মানুষের একাংশ মনে করছে, মার্কিন নীতিতে পরিবর্তন এলে যুদ্ধের উত্তাপ কমতে পারে, স্বস্তি ফিরতে পারে জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের বাজারে।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর পাকিস্তানের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে গত দুই বছরে গড়ে ওঠা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নতুন কংগ্রেসের অধীনে কতটা কার্যকর থাকবে। বিশেষ করে ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, সামরিক সহযোগিতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে ইসলামাবাদের কূটনৈতিক ভূমিকা এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ক্ষমতাকেন্দ্রে কেন উদ্বেগ
পাকিস্তানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে গত কয়েক বছর ধরে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। দেশটির সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের হোয়াইট হাউসে সরাসরি যোগাযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি উদ্যোগে সমর্থন এবং ওয়াশিংটন-তেহরান উত্তেজনা কমাতে ইসলামাবাদের মধ্যস্থতার চেষ্টা—সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন মাত্রা তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও চুক্তি এখন আইনপ্রণেতাদের নজরদারির মুখে পড়তে পারে। পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।
বিশেষ করে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠজন ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি বাণিজ্যিক উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। পাকিস্তানে ডলারের সঙ্গে যুক্ত একটি ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে সমঝোতা, নিউইয়র্কের রুজভেল্ট হোটেল পুনর্গঠনের পরিকল্পনা এবং ট্রাম্পের ছেলেদের বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ড্রোন কেনার উদ্যোগ—এসব বিষয় নতুন কংগ্রেসের তদন্ত বা রাজনৈতিক বিতর্কের আওতায় আসতে পারে।
পাকিস্তানের সাবেক কূটনীতিক ও বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এসব চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা শুধু নির্দিষ্ট প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং ইসলামাবাদ-ওয়াশিংটন সম্পর্কের সামগ্রিক পরিবেশেও প্রভাব ফেলতে পারে।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা কেন আলাদা
পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের কাছে নির্বাচনের ফলের তাৎপর্য অনেকটাই অর্থনৈতিক। দেশটি আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়ে পরিবহন, বিদ্যুৎ, খাদ্যপণ্যসহ প্রায় সব খাতে। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় পাকিস্তানের সাধারণ পরিবারগুলোও বাড়তি চাপের মুখে পড়েছে।
করাচিসহ বিভিন্ন শহরের মানুষের প্রত্যাশা, মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের শক্তিশালী অবস্থান ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধনীতি ও সামরিক পদক্ষেপের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে পারে। সংঘাত কমলে তেলের বাজারে স্বস্তি ফিরতে পারে, যার সুফল পাকিস্তানের অর্থনীতিতেও পড়বে।
অনেকের কাছে বিষয়টি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পরিবর্তন নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা এবং নিজেদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
ইসলামাবাদের সামনে নতুন কূটনৈতিক পরীক্ষা
নির্বাচনের পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তর সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। দেশটির কর্মকর্তারা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, ইসলামাবাদ ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ দমনে সহযোগিতাকে দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান মূলত বোঝাতে চাইছে, তাদের যুক্তরাষ্ট্রনীতি কোনো নির্দিষ্ট প্রেসিডেন্ট বা দলের ওপর নির্ভরশীল নয়। তবে বাস্তবে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে গড়ে ওঠা ব্যক্তিকেন্দ্রিক যোগাযোগের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ইসলামাবাদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
সম্পর্কে পরিবর্তন, নাকি নতুন সমঝোতা
ডেমোক্র্যাটদের জয় মানেই পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ভেঙে পড়বে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। সন্ত্রাসবাদ দমন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং ইরান-সংক্রান্ত কূটনীতিতে দুই দলের মধ্যেই কিছু অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা অব্যাহত থাকতে পারে।
তবে নতুন কংগ্রেস পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারে। ফলে ইসলামাবাদকে শুধু হোয়াইট হাউসের সঙ্গে সম্পর্ক নয়, কংগ্রেসের প্রভাবশালী সদস্যদের সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়াতে হবে।
সব মিলিয়ে মার্কিন নির্বাচনের ফল পাকিস্তানের জন্য একই সঙ্গে উদ্বেগ ও প্রত্যাশার বিষয় হয়ে উঠেছে। ক্ষমতাসীনদের কাছে এটি কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন পরীক্ষা, আর সাধারণ মানুষের কাছে যুদ্ধের অবসান ও অর্থনৈতিক স্বস্তির সম্ভাবনা। শেষ পর্যন্ত কোন দিকটি বাস্তব হবে, তা নির্ভর করবে নতুন কংগ্রেস ও ট্রাম্প প্রশাসনের সম্পর্ক এবং পাকিস্তানের কূটনৈতিক অভিযোজনের ওপর।
