শীতের শুরুতেই বিষাক্ত ধোঁয়াশার চাদরে ঢেকে যাচ্ছে ভারতের রাজধানী দিল্লি। বাতাসে দূষণকারী কণার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় নগরজুড়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দিল্লি-জাতীয় রাজধানী অঞ্চলে দূষণ নিয়ন্ত্রণের জরুরি ব্যবস্থা জোরদার করেছে কর্তৃপক্ষ। যানবাহন চলাচল, নির্মাণকাজ, স্কুলের পাঠদান এবং অফিসের কার্যক্রমে আনা হয়েছে নতুন বিধিনিষেধ।
নভেম্বরের শুরুতে দিল্লির বাতাসের মান দ্রুত অবনতি হতে থাকে। শুক্রবার শহরটির ২৪ ঘণ্টার গড় বায়ুমান সূচক বা একিউআই ৩৮২-এ পৌঁছায়, যা ‘অত্যন্ত খারাপ’ শ্রেণির মধ্যে পড়ে। কয়েকটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে দূষণের মাত্রা আরও বেশি পাওয়া যায়। পরিস্থিতির অবনতি এবং আবহাওয়াগত কারণে দূষণ ছড়িয়ে পড়ার গতি কমে যাওয়ায় কর্তৃপক্ষ জরুরি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়।
জরুরি বিধিনিষেধ কার্যকর
দূষণ নিয়ন্ত্রণ কমিশন দিল্লি ও আশপাশের এলাকায় গ্রেডেড রেসপন্স অ্যাকশন প্ল্যানের তৃতীয় ধাপ কার্যকর করেছে। এই ধাপে দূষণ সৃষ্টিকারী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। অপ্রয়োজনীয় নির্মাণ ও ভাঙার কাজ বন্ধ রাখা, দূষণকারী যানবাহনের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
স্কুলের ছোট শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় কিছু শ্রেণির পাঠদান অনলাইন বা মিশ্র পদ্ধতিতে পরিচালনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সম্ভব হলে বাসা থেকে কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বাসিন্দাদের অপ্রয়োজনীয় গাড়ি ব্যবহার কমানো, ছোট দূরত্বে হাঁটা বা সাইকেল চালানো এবং একাধিক কাজের জন্য বারবার বাইরে না যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য, দূষণের নতুন উৎস কমিয়ে বাতাসে ক্ষতিকর কণার ঘনত্ব কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আনা। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েক দিনের বিধিনিষেধ দিয়ে দিল্লির দীর্ঘদিনের বায়ুদূষণ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
কেন প্রতিবছর এই পরিস্থিতি
দিল্লির বায়ুদূষণের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানার নির্গমন, নির্মাণকাজের ধুলা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, আবর্জনা পোড়ানো এবং আশপাশের রাজ্যগুলোতে কৃষিজমির ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো—সব মিলিয়ে বাতাসে দূষণকারী উপাদান জমতে থাকে।
শীতের শুরুতে আবহাওয়ার পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। বাতাসের গতি কমে গেলে দূষিত কণা দ্রুত ছড়িয়ে যেতে পারে না। তাপমাত্রা ও বাতাসের স্তরবিন্যাসের কারণে দূষণ মাটির কাছাকাছি আটকে থাকে। ফলে শহরের ওপর তৈরি হয় ধোঁয়াশার ঘন স্তর।
এ বছর দীপাবলির আগেই দূষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। উৎসবের সময় আতশবাজি ব্যবহারের কারণে বাতাসে দূষণকারী কণার পরিমাণ বাড়তে পারে। তাই আগেভাগেই বিধিনিষেধ কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শিশু ও বয়স্করা
বায়ুদূষণের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং শ্বাসতন্ত্র ও হৃদ্রোগে আক্রান্ত মানুষের ওপর। বাতাসে থাকা সূক্ষ্ম কণা ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করতে পারে। এতে কাশি, শ্বাসকষ্ট, চোখ জ্বালা, গলা ব্যথা এবং দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা দেখা দিতে পারে।
দূষণ খুব বেশি থাকলে সুস্থ মানুষেরও শারীরিক অস্বস্তি হতে পারে। বিশেষ করে সকালে ও সন্ধ্যায় বাইরে দীর্ঘ সময় অবস্থান করলে ঝুঁকি বাড়ে। স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট নির্দেশনায় অপ্রয়োজনীয় বহিরাঙ্গন ব্যায়াম এড়িয়ে চলা, প্রয়োজন হলে সুরক্ষামূলক মাস্ক ব্যবহার এবং শ্বাসকষ্টের লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শুধু দিল্লির সমস্যা নয়
দিল্লির দূষণ সংকট আসলে বৃহত্তর উত্তর ভারতের পরিবেশগত সমস্যার অংশ। রাজধানীর আশপাশের রাজ্যগুলোর দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণে না আনলে দিল্লিতে নেওয়া পদক্ষেপের সুফল সীমিত থাকবে। কৃষিজমিতে ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো বন্ধে কৃষকদের বিকল্প ব্যবস্থা, শিল্পকারখানার নির্গমন নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচ্ছন্ন গণপরিবহন সম্প্রসারণ—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
দূষণ নিয়ন্ত্রণে জরুরি ব্যবস্থা সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য বছরজুড়ে পরিকল্পনা দরকার। বিশেষজ্ঞদের মতে, শহরের পরিবহনব্যবস্থা উন্নত করা, নির্মাণকাজে ধুলা নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে দূষণ পর্যবেক্ষণ বাড়ানো জরুরি।
দিল্লির সামনে এখন তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হলো ধোঁয়াশার তীব্রতা কমানো এবং মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রতিবছর শীত এলেই একই সংকট ফিরে আসা দেখিয়ে দিচ্ছে, জরুরি সতর্কতা ও সাময়িক নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি দূষণের মূল উৎসগুলো মোকাবিলায় আরও কার্যকর নীতি প্রয়োজন।
