কানাডা থেকে আলবার্টা আলাদা হওয়ার পথে এগোবে কি না, সেই প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ গণভোটের আগে প্রদেশটির ভোটারদের উদ্দেশে শেষ মুহূর্তের আবেদন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। তাঁর প্রচারের মূল বার্তা, বিচ্ছিন্নতার পথে এগোলে কানাডার অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও জাতীয় ঐক্য নিয়ে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি নিয়ে ক্ষুব্ধ আলবার্টার স্বাধীনতাপন্থীরা বলছেন, প্রদেশটির অর্থনৈতিক স্বার্থ ও রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার জন্য নতুন পথ বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আলবার্টার ভবিষ্যৎ নিয়ে এই বিতর্ক কানাডার ফেডারেল ব্যবস্থার জন্য একটি বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের এই প্রদেশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। ফলে আলবার্টার রাজনৈতিক অবস্থান বদলে গেলে তার প্রভাব শুধু প্রাদেশিক রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; জাতীয় অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কেও পড়তে পারে।
গণভোটের আগে কার্নির শেষ চেষ্টা
গণভোটে ভোটারদের সামনে মূল প্রশ্ন হলো, আলবার্টার স্বাধীনতার পথে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না। এই ভোট সরাসরি কানাডা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন রাষ্ট্র গঠনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। তবে স্বাধীনতার পক্ষে সমর্থন বাড়লে ভবিষ্যতে আরও বড় রাজনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কার্নি ভোটারদের বোঝানোর চেষ্টা করছেন, কানাডার সঙ্গে থাকা আলবার্টার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর যুক্তিতে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং বৈশ্বিক জ্বালানিবাজারের অস্থিরতার মধ্যে জাতীয় ঐক্য দুর্বল হলে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে।
আলবার্টার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ স্বাধীনতার বিরোধিতা করলেও প্রদেশের স্বাধীনতাপন্থী অংশের চাপের মধ্যে গণভোটের উদ্যোগ সামনে এসেছে। ফলে প্রাদেশিক নেতৃত্বকে একদিকে জনমতের প্রতি সাড়া দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি সম্পর্কেও সতর্ক থাকতে হচ্ছে।
কেন আলবার্টায় বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব বাড়ছে
আলবার্টার অর্থনীতি তেল ও গ্যাসশিল্পের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। প্রদেশটির অনেক বাসিন্দার অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকারের পরিবেশনীতি, কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি প্রকল্পসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত স্থানীয় অর্থনৈতিক স্বার্থকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না।
এই অসন্তোষের শিকড় বহু বছরের। জ্বালানি পরিবহনের পাইপলাইন নির্মাণ, তেল রপ্তানির সুযোগ এবং কেন্দ্রীয় রাজস্ব ব্যবস্থায় প্রদেশটির অবদান নিয়ে অটোয়ার সঙ্গে আলবার্টার মতবিরোধ রয়েছে। করোনা মহামারির সময় কেন্দ্রীয় সরকারের নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রদেশটির একাংশে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল।
স্বাধীনতাপন্থীদের মতে, আলবার্টা নিজস্ব সম্পদ ও রাজস্বের ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ পেলে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিতে পারবে। তবে সমালোচকেরা মনে করেন, স্বাধীনতার পক্ষে আবেগ থাকলেও নতুন রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল।
অর্থনীতি ও সীমান্ত নিয়ে বড় প্রশ্ন
আলবার্টা স্বাধীনতার পথে এগোলে কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য, মুদ্রা, সরকারি ঋণ, নাগরিকত্ব এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে হবে। প্রদেশটির তেল ও গ্যাস রপ্তানির বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের সঙ্গে যুক্ত। ফলে নতুন সীমান্ত বা বাণিজ্যিক ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব ফেলতে পারে।
এ ছাড়া আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি ও চুক্তিভিত্তিক অধিকার, সরকারি সম্পদের বণ্টন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে বিদ্যমান আইনি সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোটে সমর্থন পাওয়া মানেই এসব জটিল সমস্যার সমাধান হয়ে যাওয়া নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার সম্পর্কও এই বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যিক চাপ ও কানাডাকে ঘিরে তাঁর আগের মন্তব্যের কারণে জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নটি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।
কানাডার ভবিষ্যৎ কোন পথে
গণভোটে স্বাধীনতার পক্ষে সমর্থন বাড়লে কানাডার কেন্দ্রীয় সরকার ও আলবার্টার নেতৃত্বের মধ্যে নতুন আলোচনা শুরু হতে পারে। আর বিচ্ছিন্নতার উদ্যোগ প্রত্যাখ্যাত হলেও প্রদেশটির অসন্তোষ দূর করার জন্য জ্বালানি নীতি, রাজস্ব বণ্টন এবং প্রাদেশিক ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।
কার্নির জন্য তাই চ্যালেঞ্জ শুধু ভোটারদের কানাডার ঐক্যের পক্ষে আনা নয়; আলবার্টার মানুষের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনাও গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত এই গণভোট কানাডার ভৌগোলিক অখণ্ডতার পাশাপাশি দেশটির ফেডারেল ব্যবস্থায় কেন্দ্র ও প্রদেশের সম্পর্ক কতটা কার্যকর, তারও পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।
