ইন্দোনেশিয়ার বন ও ভূমিতে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ দাবানল নিয়ন্ত্রণে প্রতিবেশী দেশগুলোর সহায়তা গ্রহণে সম্মতি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো। দীর্ঘদিন ধরে চলা আগুনের ধোঁয়া সুমাত্রা ও কালিমান্তানের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়িয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। এতে বায়ুদূষণ, শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা, স্কুল ও বাইরের কার্যক্রমে বিঘ্ন এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংসের আশঙ্কা বাড়ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিদেশি সহায়তার বিষয়ে এখন কারিগরি প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
বিদেশি সহায়তা গ্রহণের সিদ্ধান্ত
ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট প্রাবোও প্রতিবেশী দেশগুলোর সহায়তা গ্রহণে সম্মতি দিয়েছেন। কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন এবং কীভাবে তা মাঠপর্যায়ে কাজে লাগানো হবে, তা নির্ধারণে দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।
মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ প্রতিবেশী দেশগুলো আগুন নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সম্ভাব্য সহায়তার মধ্যে অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, হেলিকপ্টার, বিমান, বিশেষজ্ঞ দল এবং প্রযুক্তিগত পরামর্শ থাকতে পারে। তবে কোন দেশ কতটা সহায়তা দেবে, সে বিষয়ে সব বিস্তারিত এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
বিদেশি সহায়তা গ্রহণের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পিটভূমিতে আগুন নেভানো কঠিন এবং দীর্ঘ সময় ধরে বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন হয়। একাধিক অঞ্চলে একই সঙ্গে আগুন ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বাহিনীর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।
কেন আগুন নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন
ইন্দোনেশিয়ার কিছু বনাঞ্চলে পিটভূমি রয়েছে, যেখানে মাটির নিচে পুরু জৈব পদার্থ জমা থাকে। শুকনো মৌসুমে এসব এলাকায় আগুন লাগলে তা শুধু গাছপালার ওপরের অংশে সীমাবদ্ধ থাকে না; মাটির নিচেও জ্বলতে পারে। বাইরে থেকে আগুন নিভে গেছে মনে হলেও ভেতরে দহন চলতে থাকায় আবার আগুন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
আগুনের ধোঁয়া দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। বাতাসের গতি ও দিক বদলালে এক অঞ্চলের আগুনের প্রভাব অন্য এলাকায় পৌঁছায়। ফলে আগুনের উৎস নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ধোঁয়ার বিস্তার পর্যবেক্ষণ করাও জরুরি।
শুষ্ক আবহাওয়া, উচ্চ তাপমাত্রা এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলতে পারে। তবে আগুনের বিস্তার শুধু আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে না; ভূমি ব্যবস্থাপনা ও আগুন প্রতিরোধের কার্যকারিতাও গুরুত্বপূর্ণ।
ইন্দোনেশিয়ার নিজস্ব অভিযান
বিদেশি সহায়তা গ্রহণের আগে ইন্দোনেশিয়া নিজস্বভাবে বড় পরিসরে অগ্নিনির্বাপণ অভিযান চালিয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার কর্মীকে মাঠপর্যায়ে মোতায়েন করা হয়েছে। পানি ছিটানোর বিমান, স্থলভিত্তিক দল এবং আগুনের বিস্তার পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে।
কিন্তু একাধিক প্রদেশে আগুন জ্বলতে থাকলে সব জায়গায় একই সঙ্গে পর্যাপ্ত কর্মী ও সরঞ্জাম পৌঁছানো কঠিন হয়। বিশেষ করে দুর্গম বনাঞ্চল এবং পিটভূমিতে আগুনের অবস্থান শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করতে সময় লাগে।
এ কারণে বিদেশি সহায়তা শুধু কর্মীসংখ্যা বাড়ানোর বিষয় নয়; বরং বিশেষায়িত সরঞ্জাম, আকাশপথে আগুন শনাক্তকরণ এবং বিভিন্ন অঞ্চলের কার্যক্রম সমন্বয়ের সুযোগও তৈরি করতে পারে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জনস্বাস্থ্য সংকট
দাবানলের ধোঁয়ায় ইন্দোনেশিয়ার পাশাপাশি সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং অন্য কিছু অঞ্চলে বায়ুর মান খারাপ হয়েছে। দূষিত বাতাসে থাকা সূক্ষ্ম কণা শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করে কাশি, শ্বাসকষ্ট ও চোখের জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষ বিশেষ ঝুঁকিতে থাকেন।
ধোঁয়াশার কারণে বাইরের খেলাধুলা, অনুষ্ঠান ও কিছু শিক্ষামূলক কার্যক্রম বন্ধ বা সীমিত করতে হয়েছে। বায়ুর মান খারাপ থাকলে বিমান চলাচল ও পরিবহনেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী দূষণ কর্মক্ষমতা কমিয়ে অর্থনৈতিক ক্ষতিও বাড়াতে পারে।
বন ও বন্যপ্রাণীর ক্ষতি
ইন্দোনেশিয়ার বনাঞ্চল বহু বিরল প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল। দাবানলে বন ধ্বংস হলে প্রাণীরা খাদ্য ও আশ্রয় হারায়। কিছু প্রাণী আগুনে মারা যায়, অন্যরা নিরাপদ স্থানে যাওয়ার সময় আহত হতে পারে। বন পুনরুদ্ধারে দীর্ঘ সময় লাগে এবং কিছু আবাসস্থল স্থায়ীভাবে বদলে যেতে পারে।
পিটভূমিতে আগুন জ্বললে প্রচুর কার্বন নির্গত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে দাবানল স্থানীয় পরিবেশের ক্ষতির পাশাপাশি বৈশ্বিক জলবায়ুর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
কোম্পানির দায় ও আগুন প্রতিরোধ
ইন্দোনেশিয়ার আগুনের উৎস নিয়ে ভূমি ব্যবহারকারী কোম্পানি, কৃষি কার্যক্রম এবং বন ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন সামনে এসেছে। সিঙ্গাপুরের কর্তৃপক্ষও কয়েকটি কোম্পানির জমিতে আগুনের সঙ্গে ধোঁয়ার সম্পর্ক থাকার ইঙ্গিত পাওয়ার পর নোটিশ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
তবে দায় নির্ধারণের জন্য নির্ভরযোগ্য তদন্ত প্রয়োজন। আগুন কোথায় শুরু হয়েছে, জমির মালিক কে, কোম্পানির প্রতিরোধব্যবস্থা কেমন ছিল এবং আইন লঙ্ঘন হয়েছে কি না—এসব তথ্য যাচাই করতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ
বিদেশি সহায়তা তাৎক্ষণিকভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট এড়াতে পিটভূমি সংরক্ষণ, আগুনের আগাম সতর্কতা, অবৈধ ভূমি পরিষ্কারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে বিকল্প জীবিকার সুযোগ দিতে হবে।
প্রাবোওর সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন দ্রুত সহায়তা কার্যকর করা, আগুনের উৎস নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবিকা রক্ষায় সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া।
