ইথিওপিয়ার রাজনীতিতে নতুন করে বড় ধরনের উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। দেশটির সাতটি সশস্ত্র গোষ্ঠী প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের সরকার উৎখাতের লক্ষ্য নিয়ে একটি জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই জোটে এমন কয়েকটি গোষ্ঠী রয়েছে যারা মাত্র কয়েক বছর আগেও ইথিওপিয়ার গৃহযুদ্ধে পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়েছে। ফলে নতুন এই সমন্বয় দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সাত গোষ্ঠীর নতুন জোট
নতুন জোটটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইথিওপিয়ান পিপলস ফোর্সেস অ্যালায়েন্স ফর সারভাইভাল’। জোটে রয়েছে আমহারা ফানো ন্যাশনাল মুভমেন্ট, অরোমো লিবারেশন আর্মি, টাইগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট বা টিপিএলএফ, ওগাদেন ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট, আফার রেভল্যুশনারি ডেমোক্রেটিক ইউনিটি ফ্রন্ট, বেনিশাংগুল পিপলস লিবারেশন মুভমেন্ট এবং গুমুজ পিপলস ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট।
জোটের ঘোষিত লক্ষ্য প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের নেতৃত্বাধীন ফেডারেল সরকারকে সরিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা।
যারা একসময় পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়েছে
এই জোটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সদস্যদের অতীত সম্পর্ক। টিপিএলএফ ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ইথিওপিয়ার ফেডারেল বাহিনীর সঙ্গে ভয়াবহ যুদ্ধে জড়িয়েছিল। ওই সংঘাত শেষ হয় ২০২২ সালের নভেম্বরে একটি শান্তিচুক্তির মাধ্যমে।
অন্যদিকে আমহারা ও অরোমিয়া অঞ্চলের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গেও সরকারের সংঘাত অব্যাহত রয়েছে।
অর্থাৎ নতুন জোটে এমন পক্ষগুলো একসঙ্গে এসেছে, যাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য, আঞ্চলিক স্বার্থ এবং অতীতের সংঘাত একে অপরের থেকে ভিন্ন। তাদের মধ্যে বাস্তব সমন্বয় কতটা কার্যকর হবে, তা এখনও পরিষ্কার নয়।
শান্তিচুক্তি নিয়েও নতুন প্রশ্ন
টিপিএলএফের মুখপাত্র মাইকেল আসগেদম জানিয়েছেন, তাদের সহযোগিতা রাজনৈতিক ও সামরিক—দুই ক্ষেত্রেই হতে পারে। তিনি এমন কথাও বলেছেন যে ২০২২ সালের শান্তিচুক্তি আর কার্যকর নেই।
তবে শান্তিচুক্তি ভেঙে নতুন করে বড় সংঘাত শুরু হবে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো পূর্বাভাস দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ নতুন জোটের সদস্যরা ভৌগোলিকভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থান করছে এবং তাদের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারও এক নয়।
বিশ্লেষকদের কাছে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে—জোটটি একটি কার্যকর সমন্বিত শক্তিতে পরিণত হতে পারবে, নাকি অভ্যন্তরীণ পার্থক্যের কারণে সীমিত রাজনৈতিক সহযোগিতায় আটকে থাকবে।
সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ
জোটের সদস্যরা আবি সরকারের বিরুদ্ধে নিরাপত্তাহীনতা, বাস্তুচ্যুতি, দারিদ্র্য ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। তাদের দাবি, বর্তমান সরকার দেশের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে রাজনৈতিক সংকট সমাধানে ব্যর্থ হয়েছে।
অন্যদিকে আবি সরকারের রাজনৈতিক কাঠামো দেশজুড়ে ফেডারেল কর্তৃত্ব ধরে রেখেছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে আবির সমৃদ্ধি পার্টি ক্ষমতা ধরে রাখলেও প্রধান বিরোধী দলগুলোর একটি অংশ নির্বাচন বর্জন করেছিল।
নতুন সংঘাতের আশঙ্কা
ইথিওপিয়া আফ্রিকার অন্যতম জনবহুল দেশ এবং দেশটির ভেতরের সংঘাতের আঞ্চলিক প্রভাবও রয়েছে। টাইগ্রে যুদ্ধের পর দেশটি পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে এগোনোর চেষ্টা করছিল।
কিন্তু অরোমিয়া ও আমহারা অঞ্চলে সহিংসতা, কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন আঞ্চলিক গোষ্ঠীর বিরোধ এবং এখন সাত সশস্ত্র সংগঠনের নতুন জোট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশেষ করে টিপিএলএফের মতো একটি শক্তিশালী সংগঠন নতুন জোটে যুক্ত হওয়ায় এর রাজনৈতিক গুরুত্ব বেড়েছে। তবে জোটের ঘোষণার পরপরই দেশজুড়ে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত শুরু হয়েছে—এমন তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি।
ইথিওপিয়ার সামনে কঠিন সময়
সাত গোষ্ঠীর এই জোট ইথিওপিয়ার দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকটের নতুন অধ্যায় খুলেছে। জোটটি রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে তাদের লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করবে, নাকি সশস্ত্র কর্মকাণ্ড বাড়াবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সরকারের জন্যও চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—একদিকে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা, অন্যদিকে বিভিন্ন অঞ্চলের রাজনৈতিক অসন্তোষ মোকাবিলা করা।
ফলে নতুন জোটের কার্যক্রম এবং সরকারের প্রতিক্রিয়া আগামী দিনগুলোতে ইথিওপিয়ার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
