তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা এবং চীনের সঙ্গে দ্বীপটির পুনরেকত্রীকরণের লক্ষ্য আবারও স্পষ্ট করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। চীনের জাতীয় দিবস উপলক্ষে দেওয়া বক্তব্যে তিনি তাইওয়ান প্রশ্নে বেইজিংয়ের দীর্ঘদিনের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক লক্ষ্য পূরণ এবং জাতীয় ঐক্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। শির বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তাইওয়ান নিয়ে চীনের নীতিতে কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানে শির বক্তব্য
চীনের জাতীয় দিবস ১ অক্টোবর। এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানের আগে ৩০ সেপ্টেম্বর দেওয়া বক্তব্যে শি জিনপিং দেশের অর্থনীতি ও জাতীয় উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে কথা বলেন। একই সঙ্গে তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা এবং বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপ প্রতিরোধের বিষয়ে বেইজিংয়ের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শি পূর্ণ বছরের অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের প্রচেষ্টার পাশাপাশি তাইওয়ান প্রশ্নে চীনের দৃঢ় অবস্থানের কথা বলেন। তাইওয়ানের সংবাদমাধ্যম তাইপেই টাইমসও তাঁর বক্তব্যে স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থান এবং বাইরের হস্তক্ষেপের বিরোধিতার বিষয়টি তুলে ধরেছে।
তাইওয়ান নিয়ে চীনের অবস্থান
চীন তাইওয়ানকে নিজের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে। বেইজিংয়ের নীতিতে দ্বীপটির সঙ্গে পুনরেকত্রীকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় লক্ষ্য। চীনা সরকার বলেছে, তারা শান্তিপূর্ণ উপায়ে পুনরেকত্রীকরণকে অগ্রাধিকার দেয়। তবে প্রয়োজন হলে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাও পুরোপুরি নাকচ করেনি।
অন্যদিকে তাইওয়ান নিজস্ব সরকার, নির্বাচন, সামরিক বাহিনী ও প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। দ্বীপটির রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। কেউ বেইজিংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ ও স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্ব দেন, আবার কেউ তাইওয়ানের স্বশাসন ও আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজস্ব পরিচয় জোরদার করার পক্ষে কথা বলেন।
তাইওয়ানের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান এবং চীনের সার্বভৌমত্বের দাবি পরস্পরবিরোধী হওয়ায় বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম সংবেদনশীল ইস্যু।
যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্ন
তাইওয়ান প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বেইজিংয়ের উদ্বেগের একটি বড় কারণ। ওয়াশিংটন তাইওয়ানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না রাখলেও দ্বীপটির আত্মরক্ষার সক্ষমতা বাড়াতে অস্ত্র বিক্রি করে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার পক্ষে অবস্থান নেয়।
চীন যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের পদক্ষেপকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন বলে, তাইওয়ান প্রণালিতে একতরফাভাবে স্থিতাবস্থা পরিবর্তনের বিরোধিতা করে তারা। এ অবস্থান দুই দেশের মধ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি করে।
তাইওয়ান প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ রয়েছে। সেখানে সংঘাত তৈরি হলে শুধু চীন ও তাইওয়ান নয়, বৃহত্তর এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতি ও নিরাপত্তাও প্রভাবিত হতে পারে।
অর্থনীতি ও জাতীয় ঐক্যের বার্তা
শির বক্তব্যে অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। চীন বর্তমানে প্রবৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ চাহিদা, শিল্প উৎপাদন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর মতো নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। জাতীয় দিবসের বক্তব্যে অর্থনৈতিক লক্ষ্য ও জাতীয় ঐক্যের প্রসঙ্গ তোলার মাধ্যমে তিনি দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে রাজনৈতিক ঐক্যের বিষয়টি যুক্ত করেছেন।
তবে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং তাইওয়ান প্রশ্নকে একই বক্তব্যে তুলে ধরা হলেও দুই বিষয়ের মধ্যে সরাসরি কোনো নতুন নীতিগত যোগসূত্র ঘোষণা করা হয়নি।
তাইওয়ান প্রণালিতে কী অপেক্ষা করছে
শির বক্তব্য নতুন কোনো সমঝোতার ঘোষণা নয়; বরং চীনের বিদ্যমান নীতির পুনরাবৃত্তি। তাইওয়ানের নেতৃত্বও নিজেদের স্বশাসন ও নিরাপত্তার বিষয়ে অবস্থান বজায় রেখেছে। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব কমার তাৎক্ষণিক ইঙ্গিত নেই।
আগামী দিনে সামরিক মহড়া, কূটনৈতিক যোগাযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি এবং তাইওয়ানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করবে। জাতীয় দিবসে শির বার্তা তাইওয়ান ইস্যুতে বেইজিংয়ের অবস্থান যে এখনো অপরিবর্তিত, সেটিই আবার সামনে এনেছে।
