ইন্দোনেশিয়ার বন ও ভূমিতে ছড়িয়ে পড়া দাবানলের ধোঁয়ায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি হয়েছে। ধোঁয়া ও বায়ুদূষণের কারণে প্রায় ২ লাখ ৮৩ হাজার মানুষের শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন ধরনের শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সুমাত্রা ও কালিমান্তানের বিস্তীর্ণ এলাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিবেশী দেশগুলোতেও দূষিত বাতাস পৌঁছেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইন্দোনেশিয়া নিজস্ব তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সহায়তা গ্রহণে সম্মতি দিয়েছে।
দাবানলের ধোঁয়ায় বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
ইন্দোনেশিয়ার বনাঞ্চল, কৃষিজমি এবং বিশেষ করে পিটভূমিতে আগুন লাগলে তা দীর্ঘ সময় ধরে জ্বলতে পারে। পিটভূমির মাটির নিচে জমে থাকা জৈব পদার্থ দহনের ফলে ধোঁয়া ও ক্ষতিকর কণা দীর্ঘস্থায়ীভাবে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় আগুনের দৃশ্যমান শিখা কমে গেলেও মাটির নিচে দহন চলতে থাকে।
এই ধোঁয়ায় থাকা সূক্ষ্ম কণা ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করতে পারে। এতে কাশি, চোখ জ্বালা, গলা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট এবং হাঁপানির সমস্যা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। শিশু, বয়স্ক মানুষ, গর্ভবতী নারী এবং আগে থেকেই হৃদ্রোগ বা শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
প্রায় ২ লাখ ৮৩ হাজার মানুষের শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার যে হিসাব সামনে এসেছে, তা পরিস্থিতির ব্যাপকতা তুলে ধরে। তবে আক্রান্তের সংখ্যা নির্ধারণে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নেওয়া রোগী, স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য এবং প্রকৃত সংক্রমণের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। অনেক মানুষ চিকিৎসা না নেওয়ায় সরকারি হিসাবে তাঁদের তথ্য অন্তর্ভুক্ত নাও হতে পারে।
সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে দূষণ
ইন্দোনেশিয়ার দাবানলের ধোঁয়া বাতাসের গতিপথ অনুসরণ করে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য অংশে পৌঁছেছে। সিঙ্গাপুরে বায়ুর মান খারাপ হওয়ায় বাইরের কার্যক্রম সীমিত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিছু এলাকায় ক্রীড়া অনুষ্ঠান বাতিল এবং খোলা জায়গায় দীর্ঘ সময় অবস্থান না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ধোঁয়ায় দৃশ্যমানতা কমে গেলে বিমান চলাচল ও সড়ক যোগাযোগেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। স্কুল ও কর্মক্ষেত্রে উপস্থিতি কমে যেতে পারে। বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে, কারণ তাঁদের অনেকের পক্ষেই দূষিত বাতাস এড়িয়ে চলা সম্ভব হয় না।
দাবানলের ধোঁয়া কোনো এক দেশের সীমানায় আটকে থাকে না। ফলে বন ব্যবস্থাপনা ও আগুন নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আঞ্চলিক জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশগত নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে।
আগুনের পেছনে ভূমি ব্যবহারের সমস্যা
ইন্দোনেশিয়ায় বনভূমি পরিষ্কার, কৃষিজমি তৈরি এবং কিছু ক্ষেত্রে জমি ব্যবস্থাপনার জন্য আগুন ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। পিটভূমি শুকিয়ে গেলে আগুন আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়।
জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে কিছু এলাকায় আগুনের ঝুঁকি বেড়েছে। তবে প্রতিটি দাবানলকে শুধু আবহাওয়ার ফল হিসেবে দেখা ঠিক নয়। জমির মালিকানা, ভূমি ব্যবহারের পদ্ধতি, আগুন প্রতিরোধের ব্যবস্থা এবং কোম্পানিগুলোর দায়িত্বও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সরকারের জন্য তাই আগুন নেভানোর পাশাপাশি আগুনের উৎস শনাক্ত করা, ঝুঁকিপূর্ণ জমি পর্যবেক্ষণ এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর ক্ষতি
দাবানলে শুধু মানুষের স্বাস্থ্য নয়, বনজ প্রাণী ও জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ার কিছু বনাঞ্চল বিরল প্রজাতির প্রাণীর আবাসস্থল। আগুনে বন পুড়ে গেলে প্রাণীরা খাদ্য ও আশ্রয় হারায়। অনেক প্রাণী আগুন থেকে পালাতে গিয়ে আহত হয় বা মারা যায়।
বনভূমি নষ্ট হলে কার্বন নিঃসরণও বাড়তে পারে। পিটভূমিতে দীর্ঘস্থায়ী দহন বিপুল পরিমাণ কার্বন বাতাসে ছাড়তে পারে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ আরও বাড়ায়। এভাবে দাবানল পরিবেশগত সংকটকে আরও জটিল করে তোলে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সহায়তা
ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো প্রতিবেশী দেশগুলোর সহায়তা গ্রহণে সম্মতি দিয়েছেন। আগুন নেভাতে বিমান, হেলিকপ্টার, বিশেষজ্ঞ দল এবং অন্যান্য সরঞ্জামের প্রয়োজন হতে পারে। তবে কোন দেশ কী ধরনের সহায়তা দেবে, তা নির্ধারণে কারিগরি আলোচনা চলছে।
বিদেশি সহায়তা কার্যকর করতে হলে আগুনের অবস্থান, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, উদ্ধারকর্মীদের নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সমন্বয় জরুরি। একই সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার নিজস্ব বাহিনীর সঙ্গে বিদেশি দলের কার্যক্রমের সমন্বয় করতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধান প্রয়োজন
দাবানল নিয়ন্ত্রণে শুধু জরুরি অভিযান যথেষ্ট নয়। বন ও পিটভূমি পুনরুদ্ধার, আগুনের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি, অবৈধ ভূমি পরিষ্কারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে বিকল্প জীবিকার সুযোগ দেওয়া জরুরি।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বর্তমান ধোঁয়াশা আবারও দেখিয়েছে, বন ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা সীমান্ত পেরিয়ে স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। ইন্দোনেশিয়া ও প্রতিবেশী দেশগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারলে তাৎক্ষণিক বিপর্যয় মোকাবিলার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন সংকটের ঝুঁকিও কমানো সম্ভব।
