মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাককে কারাগারের বাকি সাজা গৃহবন্দি অবস্থায় কাটানোর অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর দেশটির রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। আর সেই বিতর্কের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জানিয়েছেন, নাজিবের ক্ষমার বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্তের আগে তিনি জনআস্থা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন।
আনোয়ার একই সঙ্গে স্পষ্ট করেছেন, নাজিবের ক্ষমা পাওয়ার আবেদন করার অধিকার রয়েছে এবং তিনি সেই অধিকারকে সমর্থন করেন।
নাজিবের জন্য গৃহবন্দির সুযোগ
মালয়েশিয়ার রাজা সুলতান ইব্রাহিমের সভাপতিত্বে ফেডারেল টেরিটোরিজ পারডনস বোর্ডের বৈঠকের পর নাজিবকে শর্তসাপেক্ষ ক্ষমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এর ফলে তিনি শর্ত পূরণ করতে পারলে কারাগারের পরিবর্তে নিজ বাড়িতে থেকে বর্তমান ছয় বছরের সাজা শেষ করার সুযোগ পাবেন।
তবে এর সঙ্গে রয়েছে আর্থিক শর্ত। তাকে ৫০ মিলিয়ন মালয়েশীয় রিঙ্গিত জরিমানা পরিশোধ করতে হবে। শর্ত পূরণ না করলে গৃহবন্দির সুবিধা বাতিল হয়ে তাকে আবার কারাগারে বাকি সাজা ভোগ করতে হতে পারে।
নাজিব বর্তমানে এসআরসি ইন্টারন্যাশনাল-সংক্রান্ত মামলায় সাজা ভোগ করছেন। প্রতিষ্ঠানটি মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিল ওয়ানএমডিবির সঙ্গে যুক্ত ছিল।
আনোয়ারের উদ্বেগ কোথায়
২০ সেপ্টেম্বর এক অনুষ্ঠানে আনোয়ার বলেন, পারডনস বোর্ডের সঙ্গে আলোচনার সময় তিনি নাজিবের চলমান আইনি বিষয় এবং তার ওপর আরোপিত বড় অঙ্কের জরিমানার কথা উল্লেখ করেছিলেন।
একই সঙ্গে তিনি বোর্ডকে জনসাধারণের বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মালয়েশিয়ার ভাবমূর্তির বিষয়টি বিবেচনা করার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন।
অর্থাৎ নাজিবের ক্ষমা দেওয়ার প্রশ্নে আনোয়ারের অবস্থানকে সরাসরি সমর্থন বা বিরোধিতা হিসেবে দেখার বদলে তিনি সিদ্ধান্তটির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে সতর্ক করেছিলেন—এমনটাই তার বক্তব্য থেকে উঠে এসেছে।
‘আমি পথ তৈরি করিনি’
নাজিবের গৃহবন্দির পথ তৈরিতে আনোয়ারের সরকার ভূমিকা রেখেছে—এমন অভিযোগও উঠেছে। তবে আনোয়ার তা সরাসরি অস্বীকার করেছেন।
তিনি বলেছেন, প্রত্যেক বন্দিরই ক্ষমা চাওয়ার অধিকার রয়েছে এবং নাজিবের ক্ষেত্রেও সেই অধিকার রক্ষা করার কথা তিনি বলেছেন। কিন্তু ক্ষমা দেওয়ার চূড়ান্ত ক্ষমতা মালয়েশিয়ার রাজার।
আনোয়ারের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেল এ বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারেন, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাংবিধানিক ক্ষমতা রাজার হাতে।
পুরোনো দুর্নীতি মামলার ছায়া
নাজিবের এই ক্ষমার বিষয়টি এত আলোচিত হওয়ার পেছনে রয়েছে ওয়ানএমডিবি কেলেঙ্কারি এবং তার সঙ্গে সম্পর্কিত একাধিক মামলা। এসআরসি ইন্টারন্যাশনাল মামলায় অর্থের অপব্যবহার, বিশ্বাসভঙ্গ এবং অর্থপাচারের অভিযোগে তাকে সাজা দেওয়া হয়েছিল।
২০২৪ সালে আগের রাজকীয় ক্ষমার মাধ্যমে তার সাজা ও জরিমানা কমানো হয়েছিল। এবার নতুন সিদ্ধান্তে বাকি সাজা কারাগারের বাইরে কাটানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে তার বিরুদ্ধে অন্য মামলাগুলোর আইনি প্রক্রিয়া আলাদাভাবে চলতে পারে। আনোয়ারও জানিয়েছেন, এই ক্ষমা অন্য চলমান মামলাগুলোর ওপর প্রভাব ফেলবে না।
রাজনীতিতে বাড়ছে চাপ
নাজিবের ক্ষমার সিদ্ধান্ত মালয়েশিয়ার জোট সরকারের মধ্যেও প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন পার্টির মহাসচিব অ্যান্থনি লোকে এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে পরিবহনমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।
অন্যদিকে আনোয়ার সরকার দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান অব্যাহত রাখার কথা বলছে।
ফলে নাজিবের গৃহবন্দির প্রশ্ন এখন শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সাজা পরিবর্তনের বিষয় নয়। এটি মালয়েশিয়ার বিচারব্যবস্থা, রাজকীয় ক্ষমা, জনআস্থা এবং ক্ষমতাসীন জোটের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক—সবকিছুর ওপর নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
