যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক যখন বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তাইওয়ান ও নিরাপত্তা ইস্যুতে নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই বিরল এক কূটনৈতিক দৃশ্যের সাক্ষী হলো ওয়াশিংটন। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতেই তাকে বিমানবন্দরে গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে শিকে অভ্যর্থনা জানান ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প।
বিদেশি কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এভাবে বিমানবন্দরে গিয়ে স্বাগত জানানো সাধারণ ঘটনা নয়। বিশেষ করে শি জিনপিংয়ের মতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের নেতার ক্ষেত্রে এই আনুষ্ঠানিকতার তাৎপর্য আরও বেশি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, এর আগে দীর্ঘ সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে এমন বিমানবন্দর অভ্যর্থনার নজির খুবই বিরল ছিল।
বিমানবন্দরে জমকালো অভ্যর্থনা
জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে শি ও তার স্ত্রী পেং লিয়ুয়ান পৌঁছানোর পর লালগালিচা সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। ট্রাম্প ও মেলানিয়া সেখানে তাদের স্বাগত জানান। দুই দেশের জাতীয় সংগীত বাজানো হয়, সামরিক আনুষ্ঠানিকতা অনুষ্ঠিত হয় এবং দুই নেতা কিছুক্ষণ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন। আকাশে মার্কিন বোমারু বিমানের উড্ডয়নও ছিল অনুষ্ঠানের অংশ।
এই অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে শি জিনপিংয়ের তিন দিনের যুক্তরাষ্ট্র সফরের আনুষ্ঠানিক সূচনা হলো। সফরটি এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে, কিন্তু একই সঙ্গে বেশ কিছু মৌলিক মতপার্থক্যও রয়ে গেছে।
বাণিজ্যযুদ্ধের চাপ কমানোর চেষ্টা
শির সফরের আগে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন তাদের বিদ্যমান বাণিজ্যিক সমঝোতার মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, দুই দেশ বিদ্যমান বাণিজ্যবিরতি আরও দুই মাস বাড়াতে সম্মত হয়েছে। আগের ব্যবস্থা নভেম্বরের ১০ তারিখ পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা থাকলেও এখন তা জানুয়ারির ১০ তারিখ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
এর ফলে নতুন করে ব্যাপক শুল্কযুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা আপাতত কিছুটা পিছিয়েছে। তবে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি নিয়ে বড় ধরনের মতপার্থক্য এখনও রয়ে গেছে। বিরল খনিজ, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং কৌশলগত প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনাও সফরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
আলোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তাইওয়ান
শি-ট্রাম্প বৈঠকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে আসতে পারে। এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ এবং এর সঙ্গে যুক্ত নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের বিষয়েও আলোচনা চলছে।
এর পাশাপাশি তাইওয়ান ইস্যুও আলোচনার অন্যতম স্পর্শকাতর বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রাখলেও চীন দ্বীপটিকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে। ফলে শি-ট্রাম্প বৈঠকে এই ইস্যুতে দুই পক্ষের অবস্থান আবারও স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
উষ্ণ অভ্যর্থনার আড়ালে বড় মতপার্থক্য
বিমানবন্দরের উষ্ণ অভ্যর্থনা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সংকেত হলেও, এর অর্থ এই নয় যে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সব বিরোধ মিটে গেছে। বাণিজ্য, প্রযুক্তি, তাইওয়ান, বিরল খনিজ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোতে দুই দেশের স্বার্থ এখনও অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন।
চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্য অনুযায়ী, শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং অংশীদার হিসেবে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে মতপার্থক্য নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখে সহযোগিতার সুযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
শির সফরের পরবর্তী ধাপে হোয়াইট হাউসে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা, দুই নেতার বৈঠক এবং রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ রয়েছে। ফলে বিমানবন্দরের এই বিরল অভ্যর্থনা কেবল সফরের শুরু নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার জন্য একটি প্রতীকী সূচনাও হয়ে উঠেছে।
