যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভান্স। সরাসরি ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধকে নির্বাচনে পরাজয়ের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি বলেছেন, এই যুদ্ধই তাদের হারিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সৎভাবে আলোচনা করতে হলে প্রথমেই ইরান যুদ্ধের প্রসঙ্গ সামনে আনতে হবে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। ভান্সের এমন বক্তব্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক নীতি নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের ভেতরেই মতপার্থক্য প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে।
৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের কাছে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ হারানোর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে দলটির। এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের বাকি মেয়াদে আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দলের পরাজয়ের দায় এড়িয়ে যাওয়ার পরিবর্তে ইরান যুদ্ধকে সামনে এনে ভান্সের বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইরান যুদ্ধকেই পরাজয়ের প্রধান কারণ বললেন ভান্স
নির্বাচনের ফলাফল সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া দীর্ঘ এক পোস্টে ভান্স বলেন, রিপাবলিকানদের পরাজয়ের প্রকৃত কারণ প্রায় সবার কাছেই স্পষ্ট। আর সেটি হলো ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ। তাঁর ভাষায়, প্রেসিডেন্ট নিজেও আগের রাতে স্বীকার করেছেন যে যুদ্ধের প্রভাব নির্বাচনের ফলাফলে পড়েছে।
ভান্সের বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো, ইরান যুদ্ধের বিনিময়ে সিনেটে পরবর্তী ছয় বছরের জন্য নিয়ন্ত্রণ হারানো কতটা যৌক্তিক ছিল, সেই প্রশ্ন। তিনি কার্যত যুদ্ধের পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের কাছে এর রাজনৈতিক মূল্য ব্যাখ্যা করার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন।
তাঁর বক্তব্যের সারকথা, কেউ যদি মনে করেন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মূল্য হিসেবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানো গ্রহণযোগ্য, তাহলে সেই যুক্তি প্রকাশ্যে তুলে ধরতে হবে। একমত হওয়া কিংবা দ্বিমত পোষণ করা আলাদা বিষয়, কিন্তু পরাজয়ের প্রকৃত কারণ নিয়ে সৎ আলোচনা জরুরি।
ভান্স আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, নির্বাচনের পর দলের ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারণের আগে যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে আত্মসমালোচনা করা প্রয়োজন। তাঁর এই অবস্থান ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে। কারণ, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানকে এত দিন প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
ট্রাম্পের স্বীকারোক্তিও বাড়িয়েছে বিতর্ক
ভান্সের মন্তব্যের আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও নির্বাচনে পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধের ভূমিকা থাকার কথা স্বীকার করেছিলেন। নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরান পরিস্থিতি রিপাবলিকানদের পরাজয়ে ভূমিকা রেখেছে। তবে একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ইরানকে ঘিরে তাঁর নেওয়া পদক্ষেপের গুরুত্বও ভোটারদের বোঝা উচিত ছিল।
ট্রাম্পের এই বক্তব্যে যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে ভান্সের মন্তব্য আরও সরাসরি। তিনি শুধু যুদ্ধের প্রভাব থাকার কথা বলেননি, বরং এটিকেই পরাজয়ের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
এখানেই ট্রাম্প ও তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের রাজনৈতিক পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প যুদ্ধের সিদ্ধান্তকে এখনো সমর্থন করছেন, অন্যদিকে ভান্স নির্বাচনী বিপর্যয়ের ব্যাখ্যায় সেই সিদ্ধান্তের নেতিবাচক প্রভাবকে সামনে এনেছেন।
যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের পকেটেও
ইরান যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রভাব বোঝার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে চলা সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এর প্রভাব পড়েছে জ্বালানি তেলের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষও জ্বালানি ও জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়ের চাপ অনুভব করছেন। ফলে বিদেশে সামরিক অভিযান চালানোর পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় প্রশাসনের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
নির্বাচনী প্রচারে রিপাবলিকানদের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো ছিল গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। ভোটারদের একটি অংশের কাছে বিদেশে সামরিক অভিযানের চেয়ে নিজেদের পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভান্সের বক্তব্যেও এই অসন্তোষের বিষয়টি উঠে এসেছে। তাঁর মতে, ট্রাম্পকে সমর্থন করে ২০২৪ সালে ভোট দেওয়া অনেক মানুষ যুদ্ধের অবসান চেয়েছিলেন। তাঁরা চেয়েছিলেন প্রশাসন দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা, মূল্যস্ফীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দিকে বেশি মনোযোগ দিক। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় ভোটারদের একটি অংশের সমর্থন হারিয়েছে রিপাবলিকানরা।
ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতেও প্রশ্ন
ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্থানের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি। এই নীতির মাধ্যমে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ ও সামরিক শক্তিকে অপ্রয়োজনীয় বিদেশি সংঘাতে জড়িয়ে না ফেলে দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবেন।
কিন্তু ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সমালোচকেরা। বিশেষ করে যেসব ভোটার ট্রাম্পের কাছে নতুন কোনো বড় যুদ্ধ না করার প্রত্যাশা করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
ভান্সের বক্তব্যে এই রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। তাঁর মন্তব্যের মাধ্যমে কার্যত স্বীকার করা হয়েছে, রিপাবলিকানদের একটি অংশের ভোটার বিদেশনীতি নিয়ে প্রশাসনের সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট ছিলেন না।
এ ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের ভূমিকা নিয়েও ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল বলে ভান্সের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। অর্থাৎ পরাজয়ের পেছনে শুধু একটি সামরিক অভিযান নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক পররাষ্ট্রনীতি নিয়েও প্রশ্ন ছিল।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জে ট্রাম্প
নির্বাচনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক তাৎপর্য হলো, ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে সক্ষম হয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পাশাপাশি সিনেটেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে দলটি।
টেক্সাস, সাউথ ক্যারোলাইনা, কানসাসসহ রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কয়েকটি রাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে। এমনকি টেক্সাসে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয় দলটির রাজনৈতিক অবস্থানে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
এই ফলাফলের কারণে ট্রাম্প প্রশাসনকে এখন থেকে কংগ্রেসে অনেক বেশি বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হবে। নতুন আইন পাস, সরকারি ব্যয় অনুমোদন এবং প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন পাওয়া কঠিন হতে পারে।
এ ছাড়া কংগ্রেসের বিভিন্ন কমিটির নিয়ন্ত্রণ বিরোধীদের হাতে চলে যাওয়ায় প্রশাসনের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত ও জবাবদিহির চাপও বাড়তে পারে। ফলে নির্বাচনী বিপর্যয় শুধু রিপাবলিকানদের আসন হারানোর ঘটনা নয়, এটি ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপরও বড় আঘাত।
২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরেও নতুন হিসাব
ভান্সের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ২০২৮ সালে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেই নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ভান্সের নাম দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত থেকে কিছুটা দূরত্ব তৈরি করা তাঁর জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তুষ্ট ভোটারদের কাছে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে ভান্স এখনো ট্রাম্প প্রশাসনেরই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে যুদ্ধের সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক দায় থেকে তিনি পুরোপুরি আলাদা থাকতে পারবেন কি না, সেটিও বড় প্রশ্ন। একদিকে তিনি যুদ্ধকে নির্বাচনী পরাজয়ের কারণ বলছেন, অন্যদিকে প্রশাসনের নীতিনির্ধারণী কাঠামোর অংশ হিসেবে তাঁর নিজের ভূমিকাও আলোচনায় আসবে।
রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেও এখন পরাজয়ের কারণ নিয়ে মতপার্থক্য বাড়তে পারে। কেউ হয়তো প্রার্থীদের দুর্বলতা কিংবা নির্বাচনী প্রচারের ব্যর্থতাকে দায়ী করবেন, আবার কেউ যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে সামনে আনবেন। এই মতবিরোধ দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণেও প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরান যুদ্ধ কি বদলে দেবে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি?
ভান্সের বিস্ফোরক মন্তব্য শুধু একটি নির্বাচনী পরাজয়ের ব্যাখ্যা নয়, বরং ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে ক্ষমতাসীন শিবিরের ভেতরে জমে থাকা অসন্তোষেরও প্রকাশ। যুদ্ধের সামরিক সাফল্য নিয়ে প্রশাসন যে অবস্থানই গ্রহণ করুক না কেন, মার্কিন ভোটারদের একটি বড় অংশের কাছে এর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এখন প্রশ্ন, নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর ট্রাম্প প্রশাসন ইরান নীতিতে পরিবর্তন আনবে কি না। সংঘাতের অবসানে আলোচনার পথ বেছে নেবে, নাকি আগের অবস্থানেই অনড় থাকবে—তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও আগ্রহ বাড়ছে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান এখন আর শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির বিষয় নয়। এটি সরাসরি ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, কংগ্রেসের ক্ষমতার ভারসাম্য এবং রিপাবলিকান পার্টির ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
ভান্সের বক্তব্য সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। ট্রাম্পের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু নির্বাচনী পরাজয় কাটিয়ে ওঠা নয়, বরং নিজের দলের ভেতরে তৈরি হওয়া প্রশ্নগুলোরও জবাব দেওয়া।
