নিকারাগুয়ার রাজনীতিতে সংবিধান সংশোধনের নতুন উদ্যোগ দেশটির ক্ষমতার কাঠামো, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি করেছে। প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল ওর্তেগা ও তাঁর স্ত্রী সহ-প্রেসিডেন্ট রোসারিও মুরিয়োর সমর্থনে দেশটির আইনসভায় এমন একটি সাংবিধানিক পরিবর্তনের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে, যার মাধ্যমে বিরোধী দলগুলোর নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচিত ও রাষ্ট্রীয় পদে মেয়াদ ছয় বছর থেকে বাড়িয়ে সাত বছর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই পরিবর্তনকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিকারাগুয়ার সম্পর্ক আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে।
মধ্য আমেরিকার ছোট দেশ নিকারাগুয়া দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রয়েছে। ২০১৮ সালে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের পর থেকে দেশটির রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। বিরোধী রাজনীতিক, নাগরিক সমাজের সংগঠন এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর চাপের অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। এর মধ্যে সংবিধান সংশোধনের নতুন উদ্যোগ ওর্তেগা-মুরিয়ো সরকারের ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত করার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
সংবিধান সংশোধনে কী পরিবর্তন আনা হচ্ছে
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে নিকারাগুয়ার জাতীয় পরিষদে সাংবিধানিক সংশোধনী প্রস্তাবের প্রথম ধাপ অনুমোদিত হয়। প্রস্তাবটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিরোধী দলগুলোর নির্বাচনে অংশগ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ব্যবস্থা। সরকারপক্ষের বক্তব্য, দেশের সাংবিধানিক নীতির বিরোধিতা, বিদেশি হস্তক্ষেপের আহ্বান কিংবা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা উচিত নয়।
কিন্তু সমালোচকদের আশঙ্কা, এসব বিধান রাজনৈতিকভাবে বিস্তৃত ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করবে। ফলে সরকারবিরোধী দল, নেতা কিংবা নাগরিক আন্দোলনের কর্মীদের সহজেই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রাখার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ক্ষমতাসীনদের প্রভাব থাকলে এই বিধান বিরোধী রাজনীতির জন্য বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে।
সংশোধনীতে প্রেসিডেন্ট, সহ-প্রেসিডেন্ট, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং সেনাবাহিনী ও পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মেয়াদ ছয় বছর থেকে সাত বছর করার প্রস্তাবও রয়েছে। অর্থাৎ শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্ব নয়, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর মেয়াদও বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
তবে প্রস্তাবটি প্রথম দফায় অনুমোদিত হওয়াই চূড়ান্তভাবে কার্যকর হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। নিকারাগুয়ার সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের সংশোধনীর জন্য পরবর্তী আইনসভা অধিবেশনেও অনুমোদন প্রয়োজন। দ্বিতীয় দফার অনুমোদনপ্রক্রিয়া ২০২৭ সালের ১৮ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা।
ওর্তেগা-মুরিয়ো সরকারের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার পটভূমি
ড্যানিয়েল ওর্তেগা নিকারাগুয়ার রাজনীতিতে কয়েক দশক ধরে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। ২০০৭ সালে আবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তিনি ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিজের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছেন বলে বিরোধী ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অভিযোগ। পরবর্তী সময়ে সংবিধান সংশোধন, নির্বাচনী বিধি পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে কার্যকর হওয়া আগের সাংবিধানিক সংস্কারে প্রেসিডেন্ট ও সহ-প্রেসিডেন্টের যৌথ পদ বা সহ-প্রেসিডেন্সির ব্যবস্থা চালু হয়। এর ফলে রোসারিও মুরিয়ো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী নেতৃত্বে আনুষ্ঠানিক অবস্থান পান। একই সংস্কারে প্রেসিডেন্সির অধীনে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় ও তদারকির ক্ষমতা বাড়ানো হয়। নির্বাচন কর্তৃপক্ষের ওপরও নির্বাহী বিভাগের প্রভাব বৃদ্ধির বিষয়টি সমালোচনার জন্ম দেয়।
নতুন প্রস্তাব সেই ক্ষমতা আরও দীর্ঘস্থায়ী করার পথ তৈরি করতে পারে। সাত বছরের মেয়াদ কার্যকর হলে রাষ্ট্রের শীর্ষ পদগুলোতে নেতৃত্ব পরিবর্তনের সুযোগ আরও পিছিয়ে যাবে। বিরোধীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ সীমিত হলে ক্ষমতার পালাবদলের সাংবিধানিক পথও সংকুচিত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক কেন আরও খারাপ হচ্ছে
নিকারাগুয়ার সাংবিধানিক উদ্যোগের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ছিল কঠোর। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অভিযোগ করেছেন, নতুন সংশোধনী দেশটির গণতান্ত্রিক কাঠামোকে আরও দুর্বল করছে এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের সম্ভাবনা সংকুচিত করছে। তিনি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের নিকারাগুয়ার সরকারের সঙ্গে স্বাভাবিক ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।
ওয়াশিংটনের অবস্থান, রাজনৈতিক অধিকার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকা সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, নিকারাগুয়ার পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সংস্থা ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক ফোরামেও উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
তবে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি শুধু সংবিধান সংশোধনের কারণে নয়। ২০১৮ সালের বিক্ষোভ দমন, বিরোধী নেতাদের গ্রেপ্তার, নাগরিক সংগঠন বন্ধ এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর চাপের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটনের সঙ্গে মানাগুয়ার সম্পর্ককে উত্তেজনাপূর্ণ করে রেখেছে। নতুন সংশোধনী সেই বিরোধকে আরও গভীর করেছে।
মধ্য আমেরিকার ভূরাজনীতিতে প্রভাব
নিকারাগুয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; মধ্য আমেরিকার নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ভারসাম্যের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিকারাগুয়ার দূরত্ব বাড়লে দেশটি বিকল্প আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে পারে। রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে দেশটির নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ আগে থেকেই রয়েছে। ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বিরোধ বাড়লে এসব সম্পর্কের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে নিকারাগুয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। মধ্য আমেরিকায় রাজনৈতিক অস্থিরতা, অভিবাসন, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের সঙ্গে দেশটির স্থিতিশীলতা জড়িত। নিকারাগুয়ার রাজনৈতিক সংকট দীর্ঘায়িত হলে আশপাশের দেশগুলোর ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
অক্টোবরের শুরুতে আমেরিকান রাষ্ট্রগুলোর সংস্থা বা ওএএসে নিকারাগুয়ার নাগরিক স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। এতে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, নাগরিক অধিকার পুনর্বহাল, নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য প্রকাশ এবং অবাধ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির দাবি জানানো হয়েছে। তবে নিকারাগুয়া ২০২৩ সালে সংস্থাটি থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে কূটনৈতিক জটিলতা রয়েছে।
মানবাধিকার ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ
নিকারাগুয়ার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগও বেড়েছে। তাঁদের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, দেশটির ক্ষমতাসীন নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হওয়ার যুক্তিসংগত ভিত্তি রয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন। রাজনৈতিক বিরোধীদের আটক, নির্বাসন, নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া এবং স্বাধীন সংগঠন বন্ধ করার অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে। তবে নিকারাগুয়ার সরকার এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং আন্তর্জাতিক সমালোচনাকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
এ অবস্থায় সংবিধান সংশোধনের পরবর্তী ধাপ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রস্তাবটি দ্বিতীয় দফায় অনুমোদিত হলে বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ, নির্বাচনের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ এবং ক্ষমতার পালাবদলের সুযোগ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে নিকারাগুয়ার সম্পর্ক কোন দিকে যায়, সেটিও নির্ভর করবে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
সব মিলিয়ে নিকারাগুয়ার সাংবিধানিক পরিবর্তনকে শুধু মেয়াদ বাড়ানোর বিষয় হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ তাৎপর্য বোঝা যাবে না। নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—তিনটি ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়তে পারে। দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে প্রস্তাবিত সংশোধনীর চূড়ান্ত পরিণতি এবং সরকার বিরোধী মতের জন্য কতটা জায়গা রাখে তার ওপর।
