ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত আবারও বড় ধরনের যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে সামরিক হামলার নির্দেশ দেবেন কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ বাড়ছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী সম্ভাব্য হামলার বিভিন্ন পরিকল্পনা প্রস্তুত রেখেছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোকে সম্ভাব্য মার্কিন অভিযান এবং ইরানের পাল্টা হামলার জন্য প্রস্তুত থাকার সতর্কবার্তা দিয়েছে ওয়াশিংটন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সম্ভাব্য সামরিক অভিযানটি যুক্তরাষ্ট্রের ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর শুরু হতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ট্রাম্প এখনো নতুন হামলার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। অন্যদিকে, ইরানও কূটনৈতিক আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ করেনি। ফলে একদিকে সামরিক প্রস্তুতি, অন্যদিকে পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক তৎপরতা—দুইয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য।
নতুন হামলার জন্য প্রস্তুত মার্কিন সামরিক বাহিনী
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য নতুন সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা তৈরি করেছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে। এসব পরিকল্পনায় ইরানের সামরিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো এবং অন্যান্য কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তারা অবশ্য এখনো নতুন হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানাননি। ট্রাম্প একাধিকবার সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বললেও হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অভিযানের ঘোষণা আসেনি।
২৮ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র কয়েকটি মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশকে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের বিষয়ে সতর্ক করেছে। কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানানো হয়, নতুন অভিযান কয়েক দিন ধরে চলতে পারে। একই সঙ্গে ইরানের পাল্টা আঘাতের আশঙ্কায় উপসাগরীয় দেশগুলোকে প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে।
কেন নির্বাচনের পর হামলার আশঙ্কা?
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ৩ নভেম্বরের ভোটে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই করছে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটরা।
এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনের আগে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করলে তা মার্কিন রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক তৈরি করতে পারে। যুদ্ধের ব্যয়, মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সম্পৃক্ততা ভোটারদের আলোচনায় আসতে পারে।
তবে নির্বাচনের পর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে, এমন প্রমাণ নেই। এটি সম্ভাব্য সময়সূচি হিসেবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো, ইরানে নতুন হামলা চালালে সংঘাত শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, তা নিশ্চিত করা কঠিন।
ইরানের পাল্টা হামলার আশঙ্কায় উপসাগরীয় দেশগুলো
মার্কিন কর্মকর্তারা মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের সতর্ক করেছেন, নতুন হামলা হলে ইরান পাল্টা আঘাত হানতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি অবকাঠামো, সামরিক ঘাঁটি, বিমানবন্দর এবং গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্র লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন ও কুয়েতের মতো দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। এসব দেশে মার্কিন ঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনা থাকায় ইরানের সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক হামলার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস স্থাপনাগুলোও নিরাপত্তার দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল। কোনো বড় স্থাপনায় হামলা হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে দ্রুত প্রভাব পড়তে পারে।
এ কারণেই উপসাগরীয় দেশগুলো সামরিক সতর্কতা বাড়ানোর পাশাপাশি কূটনৈতিকভাবে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানাচ্ছে।
কাতারের মধ্যস্থতায় আবারও আলোচনা
সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান চলছে।
ইরানের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, তাদের একটি প্রতিনিধিদল কাতার থেকে ফিরে গেলেও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
ইরান এমন একটি প্রস্তাব সামনে এনেছে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল দুই দিনের মধ্যে পুরোপুরি স্বাভাবিক করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এই প্রস্তাবের বিস্তারিত শর্ত এবং ওয়াশিংটনের চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়া এখনো স্পষ্ট নয়।
কাতারের পাশাপাশি পাকিস্তানও আগের পর্যায়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও যুদ্ধবিরতির উদ্যোগে ভূমিকা রেখেছিল। ফলে নতুন করে সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের গুরুত্ব বাড়ছে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বন্দ্বের অন্যতম প্রধান কারণ দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরানকে এমন কোনো সক্ষমতা অর্জন করতে দেওয়া যাবে না, যা দেশটিকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি নিয়ে যায়।
অন্যদিকে তেহরান বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে এবং পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার তাদের রয়েছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই অভিযানে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি এবং জুন মাসে সমঝোতা স্মারক হলেও স্থায়ী সমাধান প্রতিষ্ঠিত হয়নি। নিষেধাজ্ঞা, পারমাণবিক কর্মসূচি ও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মতবিরোধ এখনো রয়ে গেছে।
ইরান কি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত?
ইরানের সামরিক সক্ষমতার বড় অংশজুড়ে রয়েছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং আঞ্চলিক মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নেটওয়ার্ক। সরাসরি মার্কিন সামরিক শক্তির সঙ্গে তুলনা করা কঠিন হলেও তেহরান পাল্টা হামলার মাধ্যমে সংঘাতের ব্যয় বাড়াতে সক্ষম।
ইরান যদি উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি কিংবা জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালায়, তাহলে সংঘাতের পরিধি দ্রুত বাড়তে পারে। লেবানন, ইয়েমেন ও ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীও পরিস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত ইরানের নিজস্ব অর্থনীতি ও অবকাঠামোর জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করবে। দেশটির জ্বালানি রপ্তানি, বন্দর, শিল্পকারখানা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের কেন্দ্রীয় প্রশ্নগুলোর একটি এখন হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথটিতে সাম্প্রতিক সময়ে তেলবাহী জাহাজে বিস্ফোরণ, অগ্নিকাণ্ড ও মাইন আঘাতের ঘটনা ঘটেছে।
ইরান এই জলপথে জাহাজ চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র অবাধ আন্তর্জাতিক নৌচলাচল নিশ্চিত করতে চায়।
যদি নতুন মার্কিন হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, তাহলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। এশিয়ার আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারে।
যুদ্ধ নাকি সমঝোতা—কোন পথে যাবে মধ্যপ্রাচ্য?
বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই ধরনের সম্ভাবনাই সামনে রয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনা প্রস্তুত, অন্যদিকে কাতারের মধ্যস্থতায় আলোচনাও চলছে। ইরান নতুন প্রস্তাবের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সেই প্রস্তাবে কী প্রতিক্রিয়া জানায়, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রাম্পের সামনে সিদ্ধান্তের দুটি বড় দিক রয়েছে—সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ইরানের ওপর চাপ বাড়ানো, অথবা আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি ও নতুন সমঝোতায় পৌঁছানো।
তবে নতুন হামলা হলে ইরানের পাল্টা আঘাত, উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার—সবকিছুই একসঙ্গে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্য আবারও বড় ধরনের যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এখনো কূটনীতির দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। আগামী কয়েক দিন, বিশেষ করে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত এবং কাতারের মধ্যস্থতায় আলোচনার অগ্রগতি নির্ধারণ করবে অঞ্চলটি নতুন যুদ্ধের দিকে যাবে, নাকি আরেকটি সমঝোতার সুযোগ তৈরি হবে।
