উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে দেশটির সম্পূর্ণ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক বৈঠকে পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি বাস্তবায়নের বিষয়ে একমত হয়েছেন। একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে অর্থ জোগায়—এমন কর্মকাণ্ড বন্ধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
৩০ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় জি-২০ বৈঠকের ফাঁকে অনুষ্ঠিত এই ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় অংশ নেন দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো হিউন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোশিমিৎসু মোতেগি। বৈঠকের পর তিন দেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, উত্তর কোরিয়ার সম্পূর্ণ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণে তাদের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। পিয়ংইয়ংয়ের ওপর বিদ্যমান আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তারা তুলে ধরেছেন।
কেন নতুন করে ঐক্যবদ্ধ তিন দেশ
উত্তর কোরিয়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পারমাণবিক অস্ত্র ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সম্প্রসারণ করেছে। দেশটির একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা, সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন এবং পারমাণবিক অস্ত্রকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অপরিহার্য অংশ হিসেবে তুলে ধরার কারণে পূর্ব এশিয়ায় উত্তেজনা বেড়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা সরাসরি নিরাপত্তা হুমকি। দুই দেশের মধ্যে স্থায়ী শান্তিচুক্তি না থাকায় সীমান্তে সামরিক উত্তেজনা যেকোনো সময় বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে। জাপানও উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে উদ্বিগ্ন। দেশটির ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে বা আশপাশের জলসীমায় ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার ঘটনা টোকিওর নিরাপত্তা পরিকল্পনায় বড় প্রভাব ফেলেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান অংশীদার। ওয়াশিংটনের মতে, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতা শুধু আঞ্চলিক নয়, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। ফলে তিন দেশের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সামরিক সমন্বয় এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করা হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব
ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে শুধু পারমাণবিক অস্ত্র নির্মূলের অঙ্গীকার নয়, উত্তর কোরিয়ার অর্থ সংগ্রহের পথ বন্ধ করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য হলো পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে অর্থ, প্রযুক্তি এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ সীমিত করা।
কিন্তু নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও উত্তর কোরিয়া নানা উপায়ে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সাইবার হামলা, ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি, বিদেশে তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী পাঠানো এবং নিষিদ্ধ পণ্য বাণিজ্যের অভিযোগ। সাম্প্রতিক সময়ে বড় অঙ্কের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির ঘটনাও এই উদ্বেগকে নতুন করে সামনে এনেছে।
তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এসব কর্মকাণ্ড শনাক্ত ও প্রকাশ করার জন্য গঠিত বহুপক্ষীয় নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষণ দলের কাজের প্রশংসা করেছেন। তাদের বক্তব্য, উত্তর কোরিয়ার নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর কৌশল মোকাবিলায় শুধু যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও বিস্তৃত সহযোগিতা প্রয়োজন।
কূটনীতি ও সামরিক প্রতিরোধ—দুই পথেই চাপ
উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধে তিন দেশ কূটনৈতিক পথ খোলা রাখার কথা বললেও সামরিক প্রস্তুতিও জোরদার করছে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে নিয়মিত যৌথ সামরিক মহড়া, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় চলছে। এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য হামলা প্রতিরোধ এবং যেকোনো সংকটে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা বাড়ানো।
তবে পিয়ংইয়ং এসব সামরিক মহড়াকে নিজেদের বিরুদ্ধে উসকানি হিসেবে দেখে। উত্তর কোরিয়ার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সামরিক চাপ বাড়িয়ে দেশটির নিরাপত্তা দুর্বল করতে চাইছে। তাই নিজেদের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে পারমাণবিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া তাদের অধিকার।
এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানই কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা কমানোর পথে বড় বাধা। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণকে আলোচনার পূর্বশর্ত হিসেবে দেখলেও উত্তর কোরিয়া আগে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং বৈরী নীতি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে কঠিন কূটনৈতিক সমীকরণ
ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের মেয়াদে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক হয়েছিল। সেই বৈঠকগুলো বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিলেও উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করার বিষয়ে স্থায়ী চুক্তি হয়নি। পরবর্তী সময়ে দুই দেশের সম্পর্কে আবারও অবিশ্বাস ও উত্তেজনা ফিরে আসে।
ট্রাম্প প্রশাসন নতুন করে আলোচনার পথ খুঁজবে কি না, তা নিয়ে নানা জল্পনা রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান হলো, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণই চূড়ান্ত লক্ষ্য। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন চাইছে, পিয়ংইয়ংয়ের ওপর চাপ বজায় রাখতে মিত্র দেশগুলো যেন কোনো অবস্থাতেই বিভক্ত না হয়।
তবে বাস্তবতা হলো, উত্তর কোরিয়া এখন পারমাণবিক অস্ত্রকে তার রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরছে। দেশটির নেতৃত্বের কাছে এই অস্ত্র শুধু সামরিক শক্তি নয়, আন্তর্জাতিক দরকষাকষির হাতিয়ারও। ফলে কেবল নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপ দিয়ে পিয়ংইয়ংকে নিরস্ত্রীকরণে রাজি করানো কঠিন হতে পারে।
পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তায় কী প্রভাব পড়বে
তিন দেশের নতুন অঙ্গীকারের ফলে পূর্ব এশিয়ায় নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তকরণ, সমুদ্র ও আকাশপথে নজরদারি এবং সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে সমন্বয় জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই উদ্যোগ উত্তর কোরিয়াকে আরও সামরিক প্রস্তুতি নিতে উৎসাহিত করতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্কও এই সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ। পিয়ংইয়ংয়ের ওপর চাপ প্রয়োগে বেইজিং ও মস্কোর সহযোগিতা ছাড়া নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি কার্যকর করা কঠিন। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কূটনৈতিক উদ্যোগ শুধু উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে নয়, বৃহত্তর আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গেও সম্পর্কের ওপর নির্ভর করবে।
তিন দেশের অঙ্গীকার তাই আপাতত একটি রাজনৈতিক বার্তা—উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি মেনে নেওয়া হবে না। কিন্তু সেই লক্ষ্য বাস্তবে অর্জন করতে হলে চাপ, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং আলোচনার মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য খুঁজে বের করতে হবে।
