ইসরায়েলের রাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল ঘিরে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি সবচেয়ে বড় দল হিসেবে উঠে এলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি তাঁর জোট। অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরের সামনে সরকার গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হলেও আরব দলগুলোর সঙ্গে জোটের প্রশ্ন এবং বিভিন্ন দলের মতপার্থক্য সেই পথকে জটিল করে তুলেছে।
২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর ভোট গণনা ও ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার গঠনের লড়াই এখন মূলত ১২০ আসনের নেসেটে ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করার হিসাবকে কেন্দ্র করে। ফলে সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া দলই যে সরকার গঠন করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
এই নির্বাচন শুধু নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নয়, গাজা যুদ্ধ, পশ্চিম তীর, ইরানের সঙ্গে সংঘাত, বিচারব্যবস্থার সংস্কার এবং ইসরায়েলের সামরিক নীতির ভবিষ্যৎও নির্ধারণ করতে পারে।
কী বলছে নির্বাচনের ফলাফল?
ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোট গণনার সময় প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটের হিসাব সামনে আসার পর লিকুদ পার্টি সবচেয়ে বড় দল হিসেবে অবস্থান করছিল। তবে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোটের আসনসংখ্যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের নিচে থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
অন্যদিকে, সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবিরের সামনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সম্ভাবনা তৈরি হয়। তবে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনে অংশীদারত্ব নিয়ে অনীহা থাকায় তাদের হিসাবও সহজ নয়।
ইসরায়েলের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কোনো দল এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে অন্য দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠন করতে হয়। ফলে নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর শুরু হয় দীর্ঘ দর-কষাকষি।
এবারও সেই একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
নেতানিয়াহুর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা নেতানিয়াহুর জন্য এবারের নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে গাজা যুদ্ধ পরিচালনা, নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা, বিচারব্যবস্থার সংস্কার এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েলের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল, তা এখনো রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, হামলার আগে নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে সরকারের মূল্যায়ন ও প্রস্তুতিতে বড় ধরনের ব্যর্থতা ছিল। যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতা, জিম্মিদের মুক্তি এবং সামরিক অভিযানের ফলাফল নিয়েও নেতানিয়াহু সরকারের ওপর চাপ রয়েছে।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহু ও তাঁর সমর্থকদের বক্তব্য, ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর সামরিক অবস্থান প্রয়োজন এবং চলমান আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে সরকারের ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ।
গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বে বিরোধীদের সম্ভাবনা
নির্বাচনে বিরোধী শিবিরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকট। সামরিক অভিজ্ঞতা ও নিরাপত্তা বিষয়ে অবস্থানের কারণে তিনি ইসরায়েলের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
তাঁর নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক শিবির নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের শাসনের বিকল্প হিসেবে নিজেদের তুলে ধরেছে। তবে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক নীতি, ফিলিস্তিন প্রশ্ন, ধর্মীয় দলগুলোর ভূমিকা এবং আরব রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।
সবচেয়ে বড় বাধা হলো, বিরোধী শিবিরের সম্ভাব্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে আরব দলগুলোর সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এসব দলকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করা কিংবা বাইরে থেকে সমর্থন নেওয়া নিয়ে বিরোধী জোটের মধ্যে ঐকমত্য নেই।
ইসরায়েলের জোট সরকার গঠনের নিয়ম
ইসরায়েলের সংসদ নেসেটে মোট ১২০টি আসন রয়েছে। সরকার গঠনের জন্য অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন প্রয়োজন।
দেশটির নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভোটাররা দলকে ভোট দেন এবং দলগুলো প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে আসন পায়। ফলে একাধিক দলকে নিয়ে জোট সরকার গঠন করা ইসরায়েলের রাজনীতিতে স্বাভাবিক ঘটনা।
নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল স্পষ্ট হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করবেন। এরপর যাঁর সরকার গঠনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, তাঁকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হবে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকার গঠনের চেষ্টা ব্যর্থ হলে অতিরিক্ত সময় দেওয়া হতে পারে। তাতেও সমাধান না এলে নতুন নির্বাচন আয়োজনের প্রয়োজন হতে পারে। ততদিন বর্তমান সরকার তত্ত্বাবধায়ক দায়িত্ব পালন করবে।
গাজা যুদ্ধ ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে কী বদলাতে পারে?
ইসরায়েলের নতুন সরকার গঠনের আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হবে গাজা। দীর্ঘ সামরিক অভিযান, মানবিক বিপর্যয় এবং যুদ্ধ-পরবর্তী প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে দেশটির রাজনীতিতে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক মিত্রদের একটি অংশ গাজায় কঠোর সামরিক অবস্থান বজায় রাখার পক্ষে। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের একটি অংশ যুদ্ধের কৌশল, জিম্মিদের মুক্তি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়গুলো নতুনভাবে বিবেচনার কথা বলছে।
পশ্চিম তীরের ভবিষ্যৎ, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা এবং ইসরায়েলের বসতি সম্প্রসারণ নিয়েও দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।
ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতও নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক মিত্রদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
বিচারব্যবস্থা ও ধর্মীয় দলগুলোর প্রভাব
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিচারব্যবস্থার সংস্কার দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের বিষয়। নেতানিয়াহু সরকারের বিচার বিভাগীয় পরিবর্তনের উদ্যোগকে সমর্থন করেছে তাঁর জোটের কিছু দল। অন্যদিকে বিরোধীরা মনে করে, এসব পরিবর্তন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ক্ষমতার ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে পারে।
ধর্মীয় দলগুলোর ভূমিকাও সরকার গঠনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। সামরিক বাহিনীতে অতি-ধর্মীয় ইহুদিদের বাধ্যতামূলক নিয়োগ, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারি সহায়তা এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে তাদের অবস্থান জোট আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
নতুন সরকার না কি আবারও নির্বাচন?
এখন পর্যন্ত নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো পক্ষই সহজে ৬১ আসনের সমর্থন নিশ্চিত করতে পারছে না। নেতানিয়াহুর দল সবচেয়ে বড় হলেও জোটের সংখ্যা যথেষ্ট নয়। আবার বিরোধীদের সম্ভাব্য সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাবেও আরব দলগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ফলে ইসরায়েলে দীর্ঘ দর-কষাকষি, রাজনৈতিক সমঝোতা কিংবা নতুন নির্বাচনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে, এবারের নির্বাচন ইসরায়েলের রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকবেন, নাকি বিরোধী শিবির নতুন সরকার গঠন করবে—তার উত্তর নির্ভর করছে জোট আলোচনার ওপর। তবে যে সরকারই দায়িত্ব নিক, গাজা, ইরান, নিরাপত্তা ও বিচারব্যবস্থার মতো জটিল ইস্যুগুলো সামাল দেওয়াই হবে তাদের প্রধান পরীক্ষা।
