দক্ষিণ চীন সাগরের বিতর্কিত স্কারবোরো শোল এলাকায় নৌ ও বিমানবাহিনী নিয়ে যুদ্ধপ্রস্তুতি টহল চালিয়েছে চীন। বেইজিংয়ের দাবি, ফিলিপাইনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড এবং চীনের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের চেষ্টার জবাব হিসেবেই এই সামরিক তৎপরতা চালানো হয়েছে। একই সময়ে ওই জলসীমায় চীনা কোস্টগার্ডও টহল জোরদার করেছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চীন ও ফিলিপাইনের মধ্যে বিরোধের কেন্দ্র হয়ে থাকা এলাকাটিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
৩০ অক্টোবর চীনের সামরিক বাহিনী জানায়, দেশটির পিপলস লিবারেশন আর্মির দক্ষিণাঞ্চলীয় থিয়েটার কমান্ডের নৌ ও বিমান ইউনিট স্কারবোরো শোলের আশপাশে যুদ্ধপ্রস্তুতি টহল পরিচালনা করেছে। চীনা সামরিক কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট জলসীমা ও আকাশসীমার ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবস্থাপনা আরও জোরদার করাই এ তৎপরতার উদ্দেশ্য। তবে ফিলিপাইনের পক্ষ থেকে চীনের অভিযোগের তাৎক্ষণিক কোনো বিস্তারিত জবাব পাওয়া যায়নি।
কেন গুরুত্বপূর্ণ স্কারবোরো শোল
স্কারবোরো শোল দক্ষিণ চীন সাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক এলাকা। ফিলিপাইনের প্রধান দ্বীপ লুজনের পশ্চিমে অবস্থিত এই প্রবালপ্রাচীর ও অগভীর জলসীমা মাছ ধরার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে এটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের কাছাকাছি হওয়ায় চীন ও ফিলিপাইন—দুই দেশের কাছেই এর সামরিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।
চীন দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকার ওপর সার্বভৌমত্ব দাবি করে আসছে। অন্যদিকে ফিলিপাইনও এলাকাটিকে নিজেদের সামুদ্রিক অধিকারের অংশ বলে মনে করে। দুই দেশের দাবির সংঘাতের কারণে সেখানে প্রায়ই কোস্টগার্ডের মুখোমুখি অবস্থান, মাছ ধরার নৌযান ঘিরে উত্তেজনা এবং সামরিক টহলের ঘটনা ঘটে।
চীনের দাবি, দক্ষিণ চীন সাগরের বড় অংশ ঐতিহাসিকভাবে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন। এ দাবির পক্ষে বেইজিং নিজেদের মানচিত্রে বিস্তৃত সামুদ্রিক সীমানা দেখায়। কিন্তু ফিলিপাইনসহ কয়েকটি দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশ এই দাবির বিরোধিতা করে। তাদের বক্তব্য, চীনের বিস্তৃত দাবি আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ও স্বীকৃত সামুদ্রিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
২০১৬ সালের রায়ও থামাতে পারেনি বিরোধ
দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গড়িয়েছে। ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত এক রায়ে জানায়, দক্ষিণ চীন সাগরের বিস্তৃত এলাকায় চীনের ঐতিহাসিক অধিকারের দাবির পক্ষে আন্তর্জাতিক আইনে পর্যাপ্ত ভিত্তি নেই। ফিলিপাইন এই রায়কে নিজেদের সামুদ্রিক অধিকারের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখে।
কিন্তু চীন ওই রায় প্রত্যাখ্যান করে আসছে। বেইজিংয়ের বক্তব্য, সালিশি আদালতের সিদ্ধান্ত তাদের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো প্রভাব ফেলে না। ফলে আইনি রায় থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে জলসীমায় দুই দেশের বিরোধ কমেনি।
চীনের সামরিক ও কোস্টগার্ড টহলকে ফিলিপাইন নিজেদের নৌ চলাচল এবং সামুদ্রিক অধিকারের ওপর চাপ হিসেবে দেখে। অন্যদিকে বেইজিং দাবি করে, তারা নিজেদের জলসীমায় নিয়মিত আইন প্রয়োগ ও নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
চলতি মাসে টহল আরও জোরদার করেছে বেইজিং
চীনা সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, অক্টোবর মাসে স্কারবোরো শোলের আশপাশে তাদের টহল কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে। ৩০ অক্টোবরের সামরিক তৎপরতার পাশাপাশি চীনা কোস্টগার্ডও একই এলাকায় আইন প্রয়োগমূলক টহল চালিয়েছে। বেইজিংয়ের ভাষ্য, ফিলিপাইনের পক্ষ থেকে অধিকার লঙ্ঘন ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের জবাব দিতেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তবে চীন ঠিক কোন ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় সামরিক টহল জোরদার করেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি। ফিলিপাইনের সামরিক বাহিনী ও বেইজিংয়ে দেশটির দূতাবাসও এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
এদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের একটি আঞ্চলিক বৈঠক ঘিরেও দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। চীন অভিযোগ করেছে, ফিলিপাইনের এক রাজনীতিক তাদের অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছেন। ফিলিপাইনের বক্তব্য, বৈঠকে চীনকে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দুই দেশের রাজনৈতিক অবিশ্বাসের গভীরতাই প্রকাশ করছে।
মাছ ধরা থেকে সামরিক আধিপত্য—বিরোধের বিস্তার
স্কারবোরো শোলের বিরোধ শুধু মানচিত্রে সীমারেখা নির্ধারণের বিষয় নয়। স্থানীয় জেলেদের জীবিকা, সামুদ্রিক সম্পদ, নৌ চলাচল এবং আঞ্চলিক সামরিক প্রভাব—সবকিছুই এর সঙ্গে জড়িত। ফিলিপাইনের জেলেরা ওই অঞ্চলে মাছ ধরতে গেলে কখনো চীনা কোস্টগার্ডের বাধার মুখে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। চীনের পক্ষ থেকে বলা হয়, তাদের আইন প্রয়োগকারী বাহিনী অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কাজ করছে।
দক্ষিণ চীন সাগর দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে। ফলে এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থায়ও প্রভাব পড়তে পারে। কোনো সংঘর্ষ ঘটলে তা শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও নজর
ফিলিপাইনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হলে ওয়াশিংটনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ চীন সাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেয় এবং চীনের একতরফা সামুদ্রিক দাবি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে। অন্যদিকে বেইজিং মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক বিরোধে হস্তক্ষেপ করে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে।
চীনের সাম্প্রতিক যুদ্ধপ্রস্তুতি টহল তাই কেবল ফিলিপাইনের উদ্দেশে দেওয়া বার্তা নয়; বরং দক্ষিণ চীন সাগরে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি ও নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা প্রদর্শনের প্রচেষ্টাও। তবে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় না থাকলে ভুল বোঝাবুঝি থেকে সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এ মুহূর্তে স্কারবোরো শোল এলাকায় নতুন কোনো বড় সংঘর্ষের খবর নেই। কিন্তু চীনের টহল জোরদার, ফিলিপাইনের আপত্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ম্যানিলার প্রতিরক্ষা সম্পর্ক—সব মিলিয়ে দক্ষিণ চীন সাগরের পরিস্থিতি আবারও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। বিরোধের স্থায়ী সমাধান না হলে এই জলসীমা এশিয়ার অন্যতম বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবেই থেকে যাবে।
