ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনে ভোট গণনার প্রাথমিক হিসাবে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট এগিয়ে থাকলেও সরকার গঠনের চূড়ান্ত চিত্র এখনো নিশ্চিত নয়। ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর ২৮ অক্টোবরের সর্বশেষ প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট গণনা শেষে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ৩২টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন ইয়াশার পার্টি পেয়েছে ২২টি আসনের হিসাব। তবে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে এগিয়ে থাকা আর সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর শিবির সেই সীমার কাছাকাছি থাকলেও বিরোধী জোটের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ছোট দলগুলোর অবস্থান শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে।
ভোট গণনার সর্বশেষ হিসাব: কোন জোট ও দল কত আসনে
ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক ফলাফলে ভোট গণনা চলমান থাকায় আসনসংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে। ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত আংশিক হিসাব অনুযায়ী জোট ও দলভিত্তিক চিত্র নিচে দেওয়া হলো।
জোট ভিত্তিক সর্বশেষ ফলাফল
| নেতানিয়াহুর বর্তমান জোট | ৬৩ |
| পরিবর্তনপন্থী বিরোধী শিবির | ৫০ |
| অন্যান্য | ৭ |
দল ভিত্তিক সর্বশেষ ফলাফল
| লিকুদ পার্টি | ৩২ |
| ইয়াশার | ২২ |
| বিয়াখাদ (একসঙ্গে) | ১২ |
| ইসরায়েল বেইতেনু | ৯ |
| ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম | ৯ |
| ওৎজমা ইয়েহুদিত | ৮ |
| জয়েন্ট লিস্ট | ৭ |
| শাস | ৭ |
| দ্য ডেমোক্র্যাটস | ৭ |
| ধর্মীয় জায়নবাদ–জেহুত | ৭ |
* মোট ১২০ আসন। এগুলো আংশিক গণনার ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রাথমিক হিসাব, চূড়ান্ত ফল নয়।
নেতানিয়াহুর জন্য কেন এখনো চ্যালেঞ্জ রয়েছে
লিকুদ পার্টি একক দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল এবং সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি পুরোপুরি পরিষ্কার হবে না। ভোট গণনার অগ্রগতির সঙ্গে দলগুলোর আসনসংখ্যা বদলাতে পারে। ফলে বর্তমান জোটের ৬৩ আসনের হিসাবকে চূড়ান্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক শক্তির মূল ভিত্তি ডানপন্থী ও ধর্মীয় দলগুলোর সমর্থন। তবে এসব দলের মধ্যে সামরিক দায়িত্ব, ধর্মীয় ছাড় এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তানীতি নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে অতি-ধর্মীয় ইহুদি পুরুষদের বাধ্যতামূলক সামরিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতির প্রশ্নটি সরকার গঠনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের প্রধান মুখ গাদি আইজেনকট। তাঁর ইয়াশার পার্টি প্রাথমিক হিসাবে ২২টি আসন পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। সাবেক সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে আইজেনকট নিরাপত্তা ও নেতৃত্বের প্রশ্নে নেতানিয়াহুর বিকল্প হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন শিবিরের লক্ষ্য হবে বিভিন্ন বিরোধী দলকে একত্র করে সরকার গঠনের মতো সমর্থন অর্জন করা।
গাজা যুদ্ধ ও নিরাপত্তার প্রশ্নে ভোটারদের অবস্থান
নির্বাচনে নিরাপত্তা পরিস্থিতি, গাজা যুদ্ধের পরিণতি এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর সরকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। নেতানিয়াহু তাঁর সমর্থকদের কাছে সামরিক সক্ষমতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে বিরোধীরা নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতার জবাবদিহি, রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিবর্তন এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে।
ইসরায়েলের অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজনও নির্বাচনী সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। এসব প্রশ্নের সমাধান নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
আরব দলগুলোর সমর্থন কি সমীকরণ বদলাবে
জয়েন্ট লিস্টের সাতটি আসন সরকার গঠনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে আরবভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোট গঠন নিয়ে ইসরায়েলের প্রধান ইহুদি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনীহা রয়েছে। ফলে সংসদে আসনসংখ্যা থাকলেও সেই সমর্থন বাস্তবে সরকার গঠনের কাজে কতটা ব্যবহার করা যাবে, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর।
ভোট গণনা শেষ হলে দলগুলোর প্রকৃত শক্তি আরও স্পষ্ট হবে। এরপর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ বিভিন্ন দলের সঙ্গে আলোচনা করে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করবেন। কোনো নেতা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন নিশ্চিত করতে না পারলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে
সর্বশেষ প্রাথমিক হিসাবে নেতানিয়াহুর শিবির এগিয়ে থাকলেও নির্বাচনের ফল এখনো চূড়ান্ত নয়। তাঁর দল লিকুদ সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়ার পথে রয়েছে, আর বিরোধী শিবিরও সরকার গঠনের সম্ভাবনা ধরে রাখতে চাইছে।
ফলে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভোট গণনার চূড়ান্ত ফল, জোটগুলোর আনুষ্ঠানিক অবস্থান এবং সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করা। ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ সরকার শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, গাজা যুদ্ধ, ফিলিস্তিন প্রশ্ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
