ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবাদ, অনশন ও নাগরিক আন্দোলনের পরিচিত ঠিকানা। দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে কৃষকের দাবি, নারীর নিরাপত্তা, ক্রীড়াবিদদের প্রতিবাদ এবং শিক্ষার্থীদের আন্দোলন—বিভিন্ন সময়ে এই জায়গা জাতীয় রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। কিন্তু ২০২৬ সালের অক্টোবরে দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তরকে নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলের মর্যাদা থেকে সরিয়ে দেওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে: রাজধানীতে নাগরিকদের প্রতিবাদের জায়গা কোথায় থাকবে?
জ্যোতির্বিদ্যার ইতিহাস থেকে প্রতিবাদের মঞ্চ
যন্তর মন্তরের মূল পরিচয় একটি জ্যোতির্বিদ্যাবিষয়ক পর্যবেক্ষণাগার হিসেবে। অষ্টাদশ শতকে জয়পুরের মহারাজা সওয়াই জয় সিং দ্বিতীয় দিল্লিসহ ভারতের বিভিন্ন স্থানে জ্যোতির্বিদ্যার পর্যবেক্ষণাগার নির্মাণ করেন। গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান, সময় এবং আকাশের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য এসব স্থাপনা তৈরি হয়েছিল।
দিল্লির যন্তর মন্তর সংসদ ভবন ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক এলাকার কাছাকাছি অবস্থিত। এই ভৌগোলিক অবস্থানই পরবর্তী সময়ে জায়গাটিকে রাজনৈতিক প্রতিবাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে দাবি জানানো, সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং নীতিনির্ধারকদের কাছে বার্তা পৌঁছে দেওয়া—এসব কারণে এটি প্রতিবাদকারীদের কাছে পরিচিত স্থান হয়ে ওঠে।
কেন যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল
১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত দিল্লির বোট ক্লাব লন ছিল বড় জনসমাবেশ ও রাজনৈতিক প্রতিবাদের অন্যতম প্রধান জায়গা। ১৯৮৮ সালে কৃষক নেতা মহেন্দ্র সিং টিকাইতের নেতৃত্বে বিশাল কৃষকসমাবেশের পর সেখানে বড় জমায়েত সীমিত করা হয়। পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে বোট ক্লাবে প্রতিবাদের সুযোগ আরও সংকুচিত হয়।
১৯৯০-এর দশকের শুরুতে যন্তর মন্তরের আশপাশের সড়ক প্রতিবাদের বিকল্প জায়গা হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করে। সংসদ ও সরকারি দপ্তরের কাছাকাছি হলেও জায়গাটি তুলনামূলক ছোট ছিল। ফলে কর্তৃপক্ষের পক্ষে জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হতো, আবার প্রতিবাদকারীরাও রাজধানীর কেন্দ্রে উপস্থিত থাকার সুযোগ পেতেন।
এভাবেই একটি ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণাগারের পাশের সড়ক ধীরে ধীরে নাগরিক অসন্তোষ প্রকাশের প্রতীকে পরিণত হয়।
আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন
২০১১ সালে সমাজকর্মী আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী অনশন যন্তর মন্তরকে দেশজুড়ে পরিচিত করে তোলে। সরকারি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর আইন ও লোকপাল প্রতিষ্ঠার দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত বড় রাজনৈতিক ঘটনায় রূপ নেয়। বিভিন্ন শহরে সমাবেশ, অনশন ও মিছিল ছড়িয়ে পড়ে।
আন্দোলনটি ভারতের নাগরিক সমাজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে। এর সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন কর্মী পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দল গঠন করেন। যন্তর মন্তর তখন শুধু প্রতিবাদের জায়গা নয়, জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনাস্থল হিসেবেও পরিচিতি পায়।
নারীর নিরাপত্তা থেকে কুস্তিগিরদের আন্দোলন
২০১২ সালে দিল্লিতে এক তরুণীর ওপর গণধর্ষণ ও পরবর্তী মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। যন্তর মন্তরসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে নারীর নিরাপত্তা, অপরাধের বিচার এবং আইন সংস্কারের দাবি ওঠে।
২০২৩ সালে ভারতের শীর্ষস্থানীয় নারী কুস্তিগিরসহ কয়েকজন ক্রীড়াবিদও এখানে দীর্ঘদিন অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, কুস্তি ফেডারেশনের তৎকালীন প্রধানের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগের যথাযথ তদন্ত হচ্ছে না। তাঁদের আন্দোলন ক্রীড়াঙ্গনে ক্ষমতার ব্যবহার, নারীর নিরাপত্তা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া নিয়ে দেশব্যাপী বিতর্ক তৈরি করে।
কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনও নানা সময়ে এখানে অবস্থান নিয়েছে। যন্তর মন্তরের গুরুত্বের একটি বড় কারণ ছিল—ভিন্ন ভিন্ন দাবি নিয়ে আসা মানুষের জন্য এটি ছিল পরিচিত ও দৃশ্যমান জায়গা।
২০২৬ সালে কেন বদল হলো
অক্টোবর ২০২৬-এ দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তরকে নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে সরিয়ে রামলীলা ময়দান, বুরারি গ্রাউন্ড এবং পূর্ব দিল্লির সিবিডি গ্রাউন্ডকে বিকল্প স্থান হিসেবে নির্ধারণ করেছে। প্রশাসনের যুক্তি, প্রতিবাদ ও জনসমাবেশের জন্য আরও উপযুক্ত জায়গা চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
তবে নাগরিক অধিকারকর্মীদের একাংশের উদ্বেগ, নতুন স্থানগুলো সংসদ ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক এলাকার তুলনায় দূরে হওয়ায় প্রতিবাদের দৃশ্যমানতা কমতে পারে। যন্তর মন্তরের পরিচিতি ছিল এর অবস্থান এবং সংবাদমাধ্যমের সহজ প্রবেশাধিকার। স্থান পরিবর্তনের ফলে আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রভাবও বদলে যেতে পারে।
প্রতিবাদের অধিকার ও জনশৃঙ্খলার ভারসাম্য
বিক্ষোভের স্থান নির্ধারণে যানজট, নিরাপত্তা, সাধারণ মানুষের চলাচল এবং জনসমাবেশের ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ গণতান্ত্রিক অধিকার। তাই বিকল্প স্থান নির্ধারণের সময় সেখানে যাতায়াত, নিরাপত্তা, গণপরিবহন এবং সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
যন্তর মন্তরের ভবিষ্যৎ ভূমিকা বদলে গেলেও এর ঐতিহাসিক পরিচয় সহজে মুছে যাবে না। এই জায়গা দেখিয়েছে, একটি শহরের স্থানও রাজনৈতিক স্মৃতি ও নাগরিক অধিকারের প্রতীকে পরিণত হতে পারে। এখন প্রশ্ন, নতুন প্রতিবাদস্থলগুলো সেই ঐতিহ্য কতটা ধারণ করতে পারবে।
