পাকিস্তানের পেশোয়ারে একটি স্কুলের ছাদ ধসে অন্তত ৩৩ শিক্ষার্থী ও এক শিক্ষকের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিক খবরে জানানো হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৪৫ জন। ক্লাস চলাকালে ভবনের একটি অংশ ভেঙে পড়ায় মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া শিক্ষার্থীদের উদ্ধারে ছুটে যান উদ্ধারকর্মী, পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা। মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনা পাকিস্তানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নিরাপত্তা, নির্মাণমান এবং নিয়মিত পরিদর্শনের ঘাটতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
ক্লাস চলার সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনা
পেশোয়ারের আল-খাইর এডুকেশন সেন্টারে দুর্ঘটনাটি ঘটে। শিক্ষার্থীরা যখন শ্রেণিকক্ষে পাঠ নিচ্ছিল, তখন ভবনের ওপরের অংশের ছাদ ধসে পড়ে। এতে একাধিক শ্রেণিকক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ভেতরে থাকা অনেক শিক্ষার্থী ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে।
দুর্ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে উদ্ধারকাজ শুরু হয়। উদ্ধারকর্মীরা ভারী ধ্বংসাবশেষ সরানোর পাশাপাশি হাতে করেও ইট, কংক্রিট ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী সরিয়ে আটকে পড়াদের খোঁজ করেন। আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে।
নিহতদের অধিকাংশই অল্পবয়সী শিক্ষার্থী হওয়ায় ঘটনাটি স্থানীয় পরিবারগুলোর জন্য ভয়াবহ শোকের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্কুলের সামনে উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের ভিড় জমে যায়। সন্তানের খোঁজে ছুটে আসা অনেক পরিবারকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে তদন্ত
প্রাথমিকভাবে ভবনের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং নির্মাণসংক্রান্ত অনিয়মের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণে তদন্ত শুরু হয়েছে। স্কুল ভবনের মালিককে আটক করার খবরও পাওয়া গেছে।
তদন্তে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে—ভবনটি নির্মাণের সময় অনুমোদিত নকশা অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, নির্মাণসামগ্রীর মান কেমন ছিল, ভবনের ওপর অতিরিক্ত তলা বা ভার চাপানো হয়েছিল কি না এবং নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না।
শুধু ছাদ ধসে পড়ার দৃশ্য দেখে চূড়ান্ত কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। প্রকৌশলগত পরীক্ষা, ভবনের নকশা এবং নির্মাণসংক্রান্ত নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
পাকিস্তানে স্কুল ভবন নিরাপত্তার সংকট
পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় নিম্নমানের নির্মাণ, অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে ছোট বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত তদারকি না থাকলে শিক্ষার্থীরা ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ক্লাস করতে বাধ্য হতে পারে।
একটি স্কুল ভবন নির্মাণের সময় শুধু কক্ষের সংখ্যা বা জায়গার পরিমাণ বিবেচনা করলেই চলে না। ভবনের ভিত্তি, ছাদ, দেয়াল, সিঁড়ি, জরুরি বহির্গমনপথ এবং অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লে ভবনের ওপর চাপও বাড়ে। তাই অনুমোদন ছাড়া অতিরিক্ত তলা নির্মাণ বা কাঠামোগত পরিবর্তন বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
স্কুলে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক শিশু অবস্থান করে। ফলে ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি শিশুদের জীবন রক্ষার মৌলিক শর্ত।
পরিবারগুলোর জন্য জরুরি সহায়তা
এ ধরনের দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসার পাশাপাশি নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য আর্থিক ও মানসিক সহায়তা প্রয়োজন। অনেক পরিবার সন্তান হারানোর শোকের পাশাপাশি চিকিৎসা, যাতায়াত ও অন্যান্য ব্যয়ের চাপেও পড়ে। আহত শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
স্কুল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের উচিত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং দুর্ঘটনার বিষয়ে স্বচ্ছ তথ্য দেওয়া। একই সঙ্গে আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা যেন অর্থের অভাবে ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করা দরকার।
ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা ঠেকানোর উপায়
পেশোয়ারের এই দুর্ঘটনা পাকিস্তানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা নিরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত করা, প্রকৌশলীদের দিয়ে নিয়মিত পরীক্ষা, নির্মাণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং জরুরি উদ্ধার মহড়া চালু করা জরুরি।
তদন্তে যদি নির্মাণগত অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে দেশের অন্যান্য স্কুল ভবনও পরীক্ষা করা প্রয়োজন, যাতে আর কোনো পরিবারকে এমন বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে না হয়।
