আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসতে পাকিস্তান প্রস্তুত থাকলেও কোনো শর্ত ছাড়াই সংলাপে রাজি নয় ইসলামাবাদ। পাকিস্তানের বক্তব্য, আফগান ভূখণ্ড থেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলা বন্ধে কার্যকর ও যাচাইযোগ্য পদক্ষেপ নিতে হবে। দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষ, বিমান হামলা এবং সশস্ত্র হামলার অভিযোগ বাড়তে থাকার মধ্যে এই অবস্থান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।
আলোচনার আগে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চায় ইসলামাবাদ
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, আফগানিস্তানের সঙ্গে আলোচনা প্রত্যাখ্যান করছে না ইসলামাবাদ। তবে আলোচনায় অগ্রগতি অর্জনের জন্য তালেবান কর্তৃপক্ষকে তাদের ভূখণ্ডে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে।
পাকিস্তানের অভিযোগ, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী আফগানিস্তানের ভেতরে অবস্থান করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নেয়। ইসলামাবাদের দাবি, এসব গোষ্ঠীর কার্যক্রম বন্ধ করতে কাবুলের পক্ষ থেকে যথেষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
তালেবান সরকার অবশ্য পাকিস্তানের অভিযোগের বিরোধিতা করে আসছে। তাদের বক্তব্য, আফগানিস্তানের ভূখণ্ড অন্য দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না এবং পাকিস্তানের নিরাপত্তা সমস্যার দায় একতরফাভাবে কাবুলের ওপর চাপানো উচিত নয়।
সীমান্তে সংঘর্ষ কেন বাড়ছে
২০২১ সালে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ফেরার পর পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের শুরুতে কিছুটা সহযোগিতার আশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সীমান্তবর্তী এলাকায় হামলা এবং নিরাপত্তা নিয়ে মতবিরোধ ক্রমে বাড়তে থাকে।
পাকিস্তান দাবি করে, আফগানিস্তানে আশ্রয় পাওয়া জঙ্গিরা সীমান্ত অতিক্রম করে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী ও বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা চালায়। অন্যদিকে আফগান তালেবান পাকিস্তানের সামরিক পদক্ষেপকে নিজেদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করেছে।
সীমান্তের দুই পাশে পরিবার, ব্যবসা ও জাতিগত সম্পর্ক রয়েছে। ফলে সীমান্ত বন্ধ হয়ে গেলে বা সংঘর্ষ বাড়লে সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও রোগীদের চলাচল ব্যাহত হয়। পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হলে স্থানীয় বাজারে দাম বাড়তে পারে এবং সীমান্তনির্ভর জীবিকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপ নিয়ে মতপার্থক্য
পাকিস্তান চায়, আফগানিস্তানের ভেতরে থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যা বাস্তবে যাচাই করা যায়। ইসলামাবাদের মতে, শুধু আশ্বাস যথেষ্ট নয়; হামলার পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও সংগঠিত হওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে হবে।
অন্যদিকে কাবুলের জন্য এ ধরনের অভিযোগের জবাব দেওয়া রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। তালেবান সরকার নিজেকে আফগানিস্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিতকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে তুলে ধরতে চায়। একই সঙ্গে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে তাদের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ রয়েছে।
কোনো গোষ্ঠীর উপস্থিতি, কর্মকাণ্ড এবং সরকারের ভূমিকা নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও কার্যকর তদন্ত প্রয়োজন। পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যে যাচাইযোগ্য তথ্য ছাড়া অগ্রগতি অর্জন কঠিন।
আঞ্চলিক মধ্যস্থতার সম্ভাবনা
পাকিস্তান জানিয়েছে, বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর আন্তরিক মধ্যস্থতার উদ্যোগে তারা আগ্রহী। তবে এমন কোনো উদ্যোগকে ফলপ্রসূ হতে হলে দুই পক্ষের নিরাপত্তা উদ্বেগকে গুরুত্ব দিতে হবে। আলোচনা শুধু বৈঠকের আয়োজন নয়; সীমান্তে হামলা কমানো, বন্দিদের বিষয়ে সমঝোতা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলাও এর অংশ হতে পারে।
আঞ্চলিক দেশগুলো উত্তেজনা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে মধ্যস্থতা সফল হওয়ার জন্য পাকিস্তান ও আফগানিস্তান—দুই পক্ষের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং বাস্তব পদক্ষেপ অপরিহার্য।
সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব
দুই দেশের সম্পর্ক খারাপ হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠী। সীমান্ত বন্ধ, গোলাগুলি এবং নিরাপত্তা অভিযানে মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে। চিকিৎসা, শিক্ষা ও বাণিজ্যের সুযোগও সংকুচিত হয়।
আফগানিস্তানের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে সংকটে রয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তানও অর্থনৈতিক চাপ ও নিরাপত্তা সমস্যার মুখোমুখি। নতুন সংঘাত উভয় দেশের জন্যই বাড়তি ব্যয় তৈরি করবে।
আলোচনার পথ কি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে
পাকিস্তানের বক্তব্যে স্পষ্ট, ইসলামাবাদ আলোচনার দরজা বন্ধ করছে না, তবে নিরাপত্তা প্রশ্নে ছাড় দিতে চায় না। এখন মূল বিষয় হলো, আফগান তালেবান সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ নেয় এবং তা যাচাইয়ের জন্য কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠে কি না।
দুই দেশের মধ্যে স্থায়ী সমাধান না হলে সীমান্ত সংঘর্ষ ও পাল্টা পদক্ষেপের ঝুঁকি বজায় থাকবে। তাই কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি বাস্তবসম্মত আলোচনার পথ খোলা রাখাই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
