ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে দেশজুড়ে আন্দোলনে নেমেছে তরুণদের সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লি ও মুম্বাইসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, ভোটাধিকার এবং রাজনৈতিক জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গন।
২০২৬ সালের ২ অক্টোবর, গান্ধী জয়ন্তীর দিন, মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে হাজারো মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। অন্যদিকে, রাজধানী দিল্লিতেও একই দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। বিরোধী রাজনৈতিক দল, শিক্ষার্থী সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশের প্রতিনিধিরা এই কর্মসূচিতে যোগ দেন। দিল্লিতে বিক্ষোভকারীদের একটি বড় অংশকে আটক করে পুলিশ। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আটক ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৭০০।
কেন নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ
বিক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর কার্যক্রম। এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিপুলসংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ককরোচ জনতা পার্টির নেতারা অভিযোগ করেছেন, নির্বাচন কমিশনের এই কার্যক্রম রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে এবং এর ফলে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সুবিধা পেতে পারে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়াকে প্রশাসনিক কার্যক্রম হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং বাদ পড়া ভোটারদের অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের কথাও সামনে এসেছে।
আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নির্ভুলতা নিশ্চিত করা না গেলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
দিল্লিতে আটক, মুম্বাইয়ে বড় সমাবেশ
দিল্লির বিক্ষোভে আম আদমি পার্টি, বামপন্থী সংগঠন এবং বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আম আদমি পার্টির নেত্রী অতিশী, সৌরভ ভরদ্বাজসহ একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। বিক্ষোভকারীদের একাংশ নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করেন।
অন্যদিকে মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে ককরোচ জনতা পার্টির জাতীয় আহ্বায়ক অভিজিৎ দীপকের নেতৃত্বে বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে চলচ্চিত্রজগতের কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তিত্বও উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ ও শাবানা আজমি, সংগীতশিল্পী বিশাল দাদলানি এবং চলচ্চিত্র পরিচালক বিশাল ভরদ্বাজ।
মুম্বাইয়ে পুলিশের অনুমতি না থাকা সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক মানুষ সমাবেশে অংশ নেন। আন্দোলনের নেতারা জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে তাঁদের কর্মসূচি শুধু একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
রাহুল গান্ধীর সমর্থন, আন্দোলন ছড়ানোর ঘোষণা
ভারতের লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীও নির্বাচন কমিশনের প্রধানের পদত্যাগের দাবি জানিয়েছেন। গান্ধী জয়ন্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে তিনি ভোট চুরির অভিযোগ তুলে তরুণদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান। তাঁর দাবি, হাজারো তরুণ শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় রাস্তায় নেমেছেন।
ককরোচ জনতা পার্টির নেতারা জানিয়েছেন, তাঁরা আগামী কয়েক মাস ধরে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। গোয়া, কলকাতা ও বেঙ্গালুরুর মতো শহরেও কর্মসূচি ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভারতের গণতন্ত্রে নতুন প্রজন্মের ভূমিকা
ককরোচ জনতা পার্টির উত্থান ভারতের রাজনীতিতে তরুণদের নতুন ধরনের অংশগ্রহণের একটি উদাহরণ হিসেবে আলোচনায় এসেছে। চলতি বছরের শুরুতে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সংগঠনটি পরিচিতি পায়। সেই আন্দোলনের পর শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনাও সংগঠনটির পরিচিতি বাড়াতে ভূমিকা রাখে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এবার নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামায় সংগঠনটি বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে। তবে আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ, জনসমর্থন এবং নির্বাচন কমিশনের প্রতিক্রিয়ার ওপর।
ভারতের নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে এই বিতর্ক এখন শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধে সীমাবদ্ধ নেই। ভোটার তালিকার নির্ভুলতা, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা এবং নাগরিকদের ভোটাধিকার রক্ষার প্রশ্নও সামনে এসেছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে এই আন্দোলন ভারতের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলে, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
