কিউবায় আবারও ধসে পড়েছে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। ১৮ সেপ্টেম্বর দেশটির পুরো বিদ্যুৎ গ্রিডে বিপর্যয় দেখা দিলে কয়েক মিলিয়ন মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। রাজধানী হাভানা থেকে দেশের অন্যান্য অঞ্চল পর্যন্ত অন্ধকার নেমে আসে। চলতি বছর এটি কিউবার অন্তত ষষ্ঠ বড় জাতীয় বিদ্যুৎ বিপর্যয়, যা দেশটির জ্বালানি সংকট ও পুরোনো বিদ্যুৎ অবকাঠামোর গভীর সমস্যাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
কীভাবে শুরু হলো বিপর্যয়
কিউবার জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পশ্চিমাঞ্চলের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থায় সমস্যার পর জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। পরে সেই বিপর্যয় দেশের অন্য অংশেও ছড়িয়ে পড়ে।
রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ সংস্থা ইউনিয়ন ইলেকত্রিকা ধীরে ধীরে সরবরাহ পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু করে। তবে পুরো ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সময় লাগছে।
কর্তৃপক্ষের মতে, অস্থিতিশীল আবহাওয়াও পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছিল।
হাভানাতেও অন্ধকার
জাতীয় গ্রিড ভেঙে পড়ার পর রাজধানী হাভানার বিপুলসংখ্যক বাসিন্দা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েন। সন্ধ্যার মধ্যে শহরের মাত্র অল্প একটি অংশে বিদ্যুৎ ফিরেছিল বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
কর্তৃপক্ষ হাসপাতালসহ জরুরি সেবাকেন্দ্রগুলোতে বিদ্যুৎ পুনঃস্থাপনকে অগ্রাধিকার দেয়। একই সঙ্গে কয়েকটি প্রদেশে ছোট ছোট বিদ্যুৎ সরবরাহ অঞ্চল বা ‘মাইক্রো-আইল্যান্ড’ তৈরি করে সীমিত পরিসরে বিদ্যুৎ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
জ্বালানি সংকট বড় কারণ
কিউবার বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো জ্বালানির ঘাটতি। দেশটির বেশিরভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন পুরোনো তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এসব কেন্দ্র সচল রাখতে পর্যাপ্ত জ্বালানি ও যন্ত্রাংশ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিউবার বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা ও চাপের প্রভাব নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। কিউবার সরকার জ্বালানি সরবরাহ সংকটের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে দায়ী করে আসছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে কিউবার অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত সমস্যার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
অর্থাৎ সংকটের কারণ নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য এক নয়। তবে বিদ্যুৎ অবকাঠামোর দুর্বলতা ও জ্বালানি সংকট যে পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে, তা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
দৈনন্দিন জীবন থমকে যাচ্ছে
কিউবায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখন শুধু আলো বা বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহারের সমস্যা নয়। বিদ্যুৎ না থাকলে পানি সরবরাহ, রান্না, যোগাযোগ, ইন্টারনেট, পরিবহন এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষের কাজের সময় কমে যাচ্ছে। কোথাও পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে, আবার বিমান চলাচলও প্রভাবিত হওয়ার খবর এসেছে। হাসপাতাল ও জরুরি সেবাগুলোকে বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
বারবার গ্রিড ধসের উদ্বেগ
গত দুই বছরে কিউবায় বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিপর্যয় বারবার ঘটেছে। চলতি বছরও মার্চ, জুলাই ও আগস্টে বড় আকারের বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঘটনা ঘটেছে। সেপ্টেম্বরের এই সর্বশেষ বিপর্যয় সেই ধারাবাহিকতাকেই আরও স্পষ্ট করেছে।
ফলে কিউবার সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—কীভাবে পুরোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সঞ্চালন ব্যবস্থা সংস্কার করে স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে।
অন্ধকার কাটলেও সংকট কাটছে না
বিদ্যুৎ পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হলেও কিউবার বিদ্যুৎ সংকট এক দিনের বিপর্যয় নয়। জ্বালানি ঘাটতি, পুরোনো অবকাঠামো, অর্থনৈতিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিরোধ—সব মিলিয়ে সমস্যাটি দীর্ঘমেয়াদি।
সর্বশেষ জাতীয় গ্রিড ধস আবারও দেখিয়ে দিল, কিউবার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কতটা নাজুক অবস্থায় রয়েছে।
