আফ্রিকার দেশ গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে দীর্ঘদিনের সংঘাত নতুন রাজনৈতিক মোড় নিয়েছে। দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট জোসেফ কাবিলা পূর্বাঞ্চলে সক্রিয় বিদ্রোহী জোটের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছেন। রুয়ান্ডা-সমর্থিত বলে অভিযুক্ত এম২৩ সশস্ত্র গোষ্ঠী ও তাদের মিত্রদের নিয়ে গঠিত জোটে কাবিলার এই ভূমিকা কঙ্গোর রাজনৈতিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিদ্রোহীরা এখন নিজেদের শুধু পূর্বাঞ্চলকেন্দ্রিক সশস্ত্র আন্দোলন হিসেবে নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
বিদ্রোহী জোটের নতুন পরিচয়
কাবিলার নেতৃত্বে আসার পর বিদ্রোহী জোট নিজেদের নতুন নামে পরিচিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। আগে ‘অ্যালায়েন্স ফ্লুভ কঙ্গো’ বা এএফসি এবং এম২৩-কে ঘিরে গড়ে ওঠা এই জোট এখন ‘রিফাউন্ডেশন অব দ্য নেশন’ নামে পরিচিত হচ্ছে। নাম পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তারা কঙ্গোর জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াতে এবং পূর্বাঞ্চলের বাইরে সমর্থন পাওয়ার লক্ষ্য তুলে ধরছে।
জোটটির দাবি, বর্তমান প্রেসিডেন্ট ফেলিক্স শিসেকেদির প্রশাসনের দুর্নীতি, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে তারা লড়ছে। তবে কঙ্গো সরকার ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ বিদ্রোহীদের কার্যক্রমকে দেশের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে দেখে। বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির পেছনে রুয়ান্ডার সমর্থন থাকার অভিযোগও দীর্ঘদিনের। কিগালি এসব অভিযোগের বিভিন্ন দিক অস্বীকার করেছে, যদিও বিদ্রোহীদের সঙ্গে নিরাপত্তাসংক্রান্ত সমন্বয়ের কথা স্বীকার করেছে বলে আন্তর্জাতিক আলোচনায় উল্লেখ রয়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ কাবিলার প্রত্যাবর্তন
জোসেফ কাবিলা ২০০১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট ছিলেন। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার কারণে দেশটির প্রশাসন, রাজনীতি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে তাঁর পরিচিতি রয়েছে। বিদ্রোহী জোটের নেতৃত্বে তাঁর উপস্থিতি আন্দোলনটিকে নতুন রাজনৈতিক মুখ দিতে পারে। বিশেষ করে কঙ্গোর দক্ষিণাঞ্চলসহ পূর্বাঞ্চলের বাইরে সমর্থন বিস্তারের ক্ষেত্রে তাঁর পরিচিতি কাজে লাগানোর চেষ্টা হতে পারে।
তবে কাবিলার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বিতর্কমুক্ত নয়। তাঁর শাসনামলের শেষদিকে ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ, নির্বাচন বিলম্বিত হওয়া এবং দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। ক্ষমতা ছাড়ার পর তাঁর রাজনৈতিক নেটওয়ার্কও আগের মতো শক্তিশালী নেই বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা। তাঁর সাবেক মিত্রদের কেউ কেউ বর্তমান সরকারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, কেউ নির্বাসনে গেছেন, আবার কেউ রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন।
কঙ্গোর একটি আদালত অনুপস্থিতিতে কাবিলাকে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের সহায়তার অভিযোগও রয়েছে। ফলে বিদ্রোহী জোটে তাঁর নেতৃত্ব সমর্থন বাড়াবে, নাকি পুরোনো রাজনৈতিক বিতর্ক আরও উসকে দেবে—তা এখনও স্পষ্ট নয়।
যুদ্ধক্ষেত্রে কি বদল আসবে
পূর্ব কঙ্গোর উত্তর কিভু ও আশপাশের অঞ্চল বহু বছর ধরে সশস্ত্র সংঘাতের কেন্দ্র। খনিজ সম্পদসমৃদ্ধ এই অঞ্চলে ভূমি, পরিচয়, স্থানীয় ক্ষমতা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। এম২৩-এর অগ্রযাত্রা বহু মানুষকে বাস্তুচ্যুত করেছে এবং মানবিক সংকট বাড়িয়েছে।
কাবিলা নেতৃত্ব গ্রহণ করলেও বিদ্রোহী জোটের সামরিক কাঠামো পুরোপুরি বদলে যায়নি। এম২৩-এর প্রভাবশালী সামরিক নেতারা এখনও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন। ফলে নতুন নেতৃত্বের রাজনৈতিক প্রভাব বাড়লেও যুদ্ধক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন ঘটবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বিদ্রোহীরা কঙ্গোর বিভিন্ন অঞ্চলে সমর্থন আদায় করতে পারবে কি না, সেটিও বড় প্রশ্ন।
শান্তি আলোচনা আরও কঠিন হবে?
কাতারের মধ্যস্থতায় কঙ্গো সরকার ও বিদ্রোহী জোটের মধ্যে শান্তি আলোচনা চলছিল। নতুন জোট জানিয়েছে, আগের আলোচনায় দেওয়া প্রতিশ্রুতি তারা বহাল রাখবে। তবে নেতৃত্বের পরিবর্তন, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং মাটিতে চলমান সংঘাত আলোচনার অগ্রগতিকে কঠিন করে তুলতে পারে।
কঙ্গো সরকারের জন্য এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—একদিকে দেশের পূর্বাঞ্চলে নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা, অন্যদিকে কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রাখা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও যুদ্ধবিরতি মেনে চলা এবং বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে আসছে।
কাবিলার নেতৃত্বে বিদ্রোহী জোটের নতুন পরিচয় কঙ্গোর সংকটে একটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন। তবে এই পরিবর্তন সংঘাত কমাবে, নাকি বিদ্রোহকে আরও বিস্তৃত করবে, তা নির্ভর করবে জোটের বাস্তব সমর্থন, সামরিক অবস্থান এবং শান্তি আলোচনায় তাদের আচরণের ওপর।
