মরক্কোর রাজনীতিতে ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটেছে। দেশটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ফাতিমা এজ্জাহরা এল মানসুরি। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ তাঁকে নতুন সরকারপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। উত্তর আফ্রিকার দেশটির রাজনীতিতে এই নিয়োগ নারী নেতৃত্ব, রাজনৈতিক সংস্কার এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মরক্কোতে প্রধানমন্ত্রী পদটি আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করে। তবে দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রাজা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী। প্রতিরক্ষা, ধর্মীয় বিষয় এবং গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্তে রাজতন্ত্রের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
এমন ব্যবস্থার মধ্যে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এল মানসুরির নিয়োগ দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠন
২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। নির্বাচনে এল মানসুরির মধ্যপন্থী উদারপন্থী দল ন্যাশনাল র্যালি অব ইন্ডিপেনডেন্টস বা আরএনআই উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়।
রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে তাঁকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি মরক্কোর প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেন।
নতুন সরকার গঠনের সময় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে সামনে এসেছে।
কে এই ফাতিমা এজ্জাহরা এল মানসুরি
ফাতিমা এজ্জাহরা এল মানসুরি মরক্কোর রাজনীতিতে পরিচিত মুখ। তিনি নগর পরিকল্পনা ও আবাসন খাতে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে মারাকেশ শহরের মেয়র হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
আইন ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি স্থানীয় সরকার পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা রাজনৈতিক পরিচিতি বাড়িয়েছে। মরক্কোর নগর উন্নয়ন, আবাসন এবং স্থানীয় প্রশাসনের বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা নতুন সরকার পরিচালনায় কাজে লাগতে পারে।
তবে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বের পরিধি নগর প্রশাসনের তুলনায় অনেক বিস্তৃত। জাতীয় অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সংসদীয় সমন্বয় এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে নীতিগত ঐক্য প্রতিষ্ঠা তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
নারী নেতৃত্বে ঐতিহাসিক পরিবর্তন
মরক্কো উত্তর আফ্রিকা ও আরব বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ। দেশটির রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে।
প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এল মানসুরির নিয়োগ এই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নারী নেতৃত্বের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের অংশগ্রহণের প্রশ্নও সামনে এসেছে।
তবে শুধু একজন নারী প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের মাধ্যমে রাজনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য দূর হয়ে যাবে, এমন নয়। নারী কর্মসংস্থান, শিক্ষা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং সামাজিক অধিকার নিয়ে দেশটিতে আরও নীতিগত পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে।
অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান হবে বড় পরীক্ষা
মরক্কোর নতুন সরকারের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
দেশটির অর্থনীতি পর্যটন, কৃষি, শিল্প উৎপাদন এবং রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নে মরক্কো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।
তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব অংশের কাছে পৌঁছানো গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামীণ অঞ্চলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি, পানি সংকট এবং আয়বৈষম্যও সরকারের নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলবে।
এ ছাড়া ২০৩০ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতি মরক্কোর অবকাঠামো ও পর্যটন খাতে বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি করছে।
রাজতন্ত্র ও নির্বাচিত সরকারের সম্পর্ক
মরক্কোর রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রাজা ও নির্বাচিত সরকারের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সরকার পরিচালনা করলেও রাজতন্ত্রের সাংবিধানিক ক্ষমতা উল্লেখযোগ্য।
নতুন প্রধানমন্ত্রীকে তাই সংসদীয় রাজনীতি, রাজতন্ত্রের সঙ্গে সমন্বয় এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
এল মানসুরির নিয়োগ মরক্কোর রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে। তবে তাঁর সরকারের সাফল্য নির্ভর করবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং প্রশাসনিক দক্ষতার ওপর। নারী নেতৃত্বের ঐতিহাসিক গুরুত্বের পাশাপাশি এসব বাস্তব চ্যালেঞ্জই তাঁর রাজনৈতিক মেয়াদের মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
