মরক্কোয় শুরু হয়েছে বহুল আলোচিত সংসদ নির্বাচন। বুধবারের এই ভোটে ২৭টি রাজনৈতিক দলের ৭ হাজার ২৮৮ জন প্রার্থী ৩৯৫টি সংসদীয় আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে এবারের নির্বাচন শুধু নতুন সংসদ গঠনের ভোট নয়; গত বছরের তরুণদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ, কর্মসংস্থানের সংকট, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থার চাপ এবং রাজনীতির প্রতি আস্থার প্রশ্নও ভোটারদের সামনে বড় বিষয় হয়ে উঠেছে।
ভোটের মাঠে বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতা
মরক্কোর এবারের নির্বাচনে ৩৯৫টি আসনের জন্য ২৭টি রাজনৈতিক দল লড়ছে। নির্বাচনের পর যে দল সবচেয়ে বেশি আসন পাবে, সংবিধান অনুযায়ী রাজা সেই দলের নেতা বা মনোনীত ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করবেন।
তবে একক কোনো দলের পক্ষে পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া কঠিন হওয়ায় নির্বাচনের পর জোট সরকার গঠনের প্রয়োজন হতে পারে। ফলে ভোটের ফল শুধু কোন দল কত আসন পেল, তা নয়—পরবর্তী সরকার কোন রাজনৈতিক সমীকরণে গঠিত হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বর্তমান রাজনৈতিক শক্তিগুলো প্রচারে চাকরি, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও আয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ক্ষমতাসীন জোটের দলগুলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও নতুন কর্মসংস্থানের কথা বলছে। বিরোধী দলগুলো জোর দিচ্ছে সামাজিক বৈষম্য কমানো, সরকারি সেবা উন্নত করা এবং রাজনৈতিক সংস্কারের ওপর।
তরুণদের ক্ষোভ এবার ভোটের কেন্দ্রে
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি তরুণ ভোটারদের অবস্থান। গত বছর মরক্কোর বিভিন্ন শহরে তরুণদের নেতৃত্বে বড় বিক্ষোভ হয়েছিল। তাদের দাবির কেন্দ্রে ছিল উন্নত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, চাকরি, সামাজিক সুযোগ এবং সরকারি জবাবদিহি।
বিক্ষোভের পর রাজনৈতিক দলগুলো তরুণদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা বাড়িয়েছে। কিন্তু তরুণদের একটি অংশ এখনও প্রচলিত রাজনীতির প্রতি অনাস্থার কথা বলছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মরক্কোয় তরুণদের বেকারত্বের হার ৩৭ শতাংশে পৌঁছেছিল। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী প্রায় ২৯ লাখ তরুণ শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণের বাইরে ছিল। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও কর্মসংস্থানের প্রশ্নটি তরুণদের কাছে বড় সমস্যা হয়ে আছে।
নিবন্ধিত ভোটার কমেছে
মরক্কোর প্রায় ২ কোটি ৬৭ লাখ ভোটার হওয়ার বয়সী মানুষের মধ্যে ১ কোটি ৫৮ লাখ ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন। ২০২১ সালের নির্বাচনের তুলনায় নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৯ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে, যদিও এ সময় দেশটির জনসংখ্যা বেড়েছে।
এ কারণে ভোটার উপস্থিতি এবারের নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কতটা হয়, তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
বিশ্বকাপের আগের নির্বাচন
মরক্কো ২০৩০ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অবকাঠামো, পরিবহন, পর্যটন ও নগর উন্নয়নে বড় বিনিয়োগ চলছে। ফলে নতুন সরকারকে একদিকে এসব বড় প্রকল্প এগিয়ে নিতে হবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে তাই এবারের নির্বাচনের সঙ্গে উন্নয়ন ও জনসেবার প্রশ্নকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখা হচ্ছে। দেশের অর্থনীতি বাড়লেও সেই প্রবৃদ্ধির সুবিধা সব অঞ্চলে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না—এমন অভিযোগও রয়েছে।
রাজনীতির প্রতি আস্থাই বড় পরীক্ষা
মরক্কোর এবারের ভোটে সরকার গঠন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কত মানুষ ভোট দিতে আসেন। তরুণদের একাংশ যদি ভোটের বদলে রাজপথ বা রাজনৈতিক বয়কটের পথ বেছে নেয়, তাহলে নির্বাচনী অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে তরুণদের একটি অংশ মনে করছে, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে নিজেদের দাবি সামনে আনার সুযোগ রয়েছে। ফলে বুধবারের ভোট শুধু সংসদে নতুন প্রতিনিধিদের পাঠানোর নির্বাচন নয়; এটি তরুণ প্রজন্ম ও প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার সম্পর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
