দক্ষিণ চীন সাগরে সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ে চীনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ফিলিপাইন। ম্যানিলার অভিযোগ, চীনের রাষ্ট্রদূত এমন মন্তব্য করেছেন, যা দুই দেশের মধ্যে সামরিক শক্তি প্রয়োগের পরোক্ষ হুমকি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ ঘটনায় চীনা রাষ্ট্রদূতকে তলবের উদ্যোগ নিয়েছে ফিলিপাইন সরকার। সমুদ্রসীমা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের মধ্যে এই কূটনৈতিক পদক্ষেপ দুই দেশের সম্পর্কে নতুন চাপ তৈরি করেছে।
কী বলেছিলেন চীনা রাষ্ট্রদূত
চীনের রাষ্ট্রদূত জিং কোয়ান বলেছেন, চীন ও ফিলিপাইনের মধ্যে সংঘাত হলে চীন জয়ী হবে। ফিলিপাইনের কর্মকর্তারা এই বক্তব্যকে শক্তি প্রয়োগের ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছেন। তাঁদের মতে, এ ধরনের মন্তব্য আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর পরিবর্তে বাড়িয়ে দিতে পারে।
ফিলিপাইন সরকার জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের দায়িত্বশীল ভাষা ব্যবহার করা উচিত। কোনো দেশের সঙ্গে মতবিরোধ থাকলেও সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা নিয়ে এমন বক্তব্য পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করতে পারে।
চীনা দূতাবাস অবশ্য দাবি করেছে, রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বেইজিংয়ের অবস্থান, দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সার্বভৌমত্বের দাবি অক্ষুণ্ন থাকবে এবং দেশটি নিজের স্বার্থ রক্ষায় দৃঢ় থাকবে।
দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধ
দক্ষিণ চীন সাগর বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথগুলোর একটি। এ অঞ্চল দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন করা হয়। একই সঙ্গে মাছ ধরার ক্ষেত্র এবং সম্ভাব্য জ্বালানি সম্পদের কারণে সমুদ্রটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক।
চীন সমুদ্রের বিস্তীর্ণ অংশের ওপর দাবি করে আসছে। ফিলিপাইনসহ কয়েকটি দেশ এসব দাবির বিরোধিতা করছে। দ্বীপ, প্রবালপ্রাচীর ও জলসীমার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের জাহাজ প্রায়ই মুখোমুখি অবস্থানে আসে।
২০১৬ সালের আন্তর্জাতিক সালিশি রায়ে চীনের বিস্তৃত ঐতিহাসিক দাবির পক্ষে আইনি ভিত্তি পাওয়া যায়নি বলে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছিল। চীন ওই রায় প্রত্যাখ্যান করে। ফলে আইনি অবস্থান ও বাস্তব সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে বিরোধ এখনো অব্যাহত।
ফিলিপাইনের নিরাপত্তা হিসাব
ফিলিপাইন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা চুক্তি বজায় রেখেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশ যৌথ সামরিক মহড়া, প্রশিক্ষণ এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়িয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সামরিক উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ম্যানিলাও তার নিরাপত্তা সক্ষমতা জোরদার করার চেষ্টা করছে।
তবে ফিলিপাইন ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, পর্যটন, পণ্য পরিবহন এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যে প্রভাব পড়তে পারে। তাই ফিলিপাইনের সামনে একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা এবং সংঘাত এড়ানোর চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
তাইওয়ান ঘিরে উত্তেজনার প্রভাব
তাইওয়ানকে ঘিরে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা দক্ষিণ চীন সাগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ মনে করে। অন্যদিকে তাইওয়ানের নিজস্ব সরকার ও নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের আত্মরক্ষার সক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।
ফিলিপাইনের উত্তরাঞ্চল তাইওয়ানের কাছাকাছি হওয়ায় অঞ্চলটির কৌশলগত গুরুত্ব বেড়েছে। তাইওয়ান ঘিরে সামরিক সংকট দেখা দিলে ফিলিপাইনের ভূখণ্ড, সমুদ্রপথ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এ কারণে দক্ষিণ চীন সাগরের কোনো সীমিত বিরোধও বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়তে পারে।
ভুল হিসাব থেকে সংঘাতের আশঙ্কা
দুই দেশের জাহাজের মুখোমুখি অবস্থান, সরবরাহ মিশন এবং সামুদ্রিক নজরদারি কার্যক্রমের সময় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তা দ্রুত কূটনৈতিক সংকটে পরিণত হতে পারে। নাবিক আহত হওয়া বা জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো ঘটনা জনমত ও রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়ে দিতে পারে।
সামরিক শক্তি প্রদর্শনের উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে সতর্ক করা হলেও, অতিরিক্ত কঠোর বক্তব্য ভুল সংকেত তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যখন দুই পক্ষের সঙ্গে আঞ্চলিক মিত্র ও প্রতিরক্ষা অংশীদার যুক্ত, তখন সীমিত সংঘর্ষও বড় সংকটের দিকে যেতে পারে।
কূটনীতির মাধ্যমে উত্তেজনা কমানো সম্ভব?
রাষ্ট্রদূতকে তলব করা সাধারণত কোনো দেশের আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এর মাধ্যমে ফিলিপাইন চীনের কাছে নিজের আপত্তি স্পষ্ট করতে পারে এবং ভবিষ্যতে দায়িত্বশীল বক্তব্যের আহ্বান জানাতে পারে।
তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য শুধু কূটনৈতিক প্রতিবাদ যথেষ্ট নয়। দুই দেশের মধ্যে সামুদ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা, সংঘর্ষ এড়ানোর নিয়ম এবং বিরোধ নিষ্পত্তির আলোচনা কার্যকর রাখা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক আইন ও নিরাপদ নৌচলাচলের নীতিও গুরুত্বপূর্ণ।
ফিলিপাইনের প্রতিবাদ দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধকে আবারও সামনে এনেছে। এখন চীনের প্রতিক্রিয়া এবং দুই দেশের পরবর্তী কূটনৈতিক যোগাযোগই নির্ধারণ করবে, উত্তেজনা আরও বাড়বে, নাকি আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
