মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেওয়ার পরও বেঁচে গেছেন যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের এক নারী। ক্রিস্টা গেইল পাইক নামের ওই বন্দিকে ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য নির্ধারিত পদ্ধতিতে ওষুধ প্রয়োগ করা হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু হয়নি। বরং দুই দফা প্রাণঘাতী ওষুধ দেওয়ার পরও তিনি জীবিত ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ইতিহাসে এই ঘটনাকে নজিরবিহীন বলে বর্ণনা করেছেন একজন বিশেষজ্ঞ।
৫০ বছর বয়সী পাইককে প্রায় তিন দশক আগে সংঘটিত একটি হত্যাকাণ্ডের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। ১৯৯৫ সালে ১৮ বছর বয়সে সংঘটিত ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়। টেনেসিতে প্রায় ২০০ বছরের মধ্যে কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রথম ঘটনা হতে যাচ্ছিল এটি। কিন্তু প্রাণঘাতী ইনজেকশন প্রয়োগের ব্যর্থতায় সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
ঘটনার পর অঙ্গরাজ্যটির গভর্নর বিল লি চলতি বছরের বাকি সময়ের জন্য মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কার্যক্রম স্থগিত করেছেন এবং পুরো ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দিন যা ঘটেছিল
৩০ সেপ্টেম্বর সকালে পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক ঘণ্টা আগে একটি আপিল আদালত সাময়িকভাবে কার্যক্রম স্থগিত করার নির্দেশ দেয়। পরে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট সেই স্থগিতাদেশ বাতিল করলে আবারও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পথ খুলে যায়।
সন্ধ্যায় কারাগারের নির্ধারিত কক্ষে পাইককে স্ট্রেচারে বেঁধে রাখা হয়। প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে উপস্থিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা আলাদা কক্ষ থেকে পুরো প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেন।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে নিজের শেষ বক্তব্যে পাইক বলেন, জীবনের অধিকাংশ সময় যেভাবে ভালোবাসার মধ্যে কাটিয়েছেন, পৃথিবী থেকেও সেভাবেই বিদায় নিতে চান। তিনি নিজেকে শান্তিতে আছেন বলেও জানান।
এরপর তাঁকে পেন্টোবারবিটাল নামের প্রাণঘাতী ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু প্রত্যাশিত ফল না আসায় দ্বিতীয়বারও একই ওষুধ দেওয়া হয়। তাতেও তাঁর মৃত্যু হয়নি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, প্রক্রিয়ার একপর্যায়ে পাইককে নিজের মাথা তুলতে দেখা যায়। তিনি কারা কর্মকর্তাদের কাছে নিজের হাতে অনুভূত অস্বস্তি সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। পরে পর্দার আড়াল থেকে তাঁর নাক ডাকার শব্দও শোনা যায়।
হাসপাতালে নেওয়া হলো বন্দিকে
দুই দফা ওষুধ প্রয়োগের পরও জীবিত থাকায় পাইককে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাঁর আইনজীবীরা জানান, তাঁকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। তবে তাঁর শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য তাঁদের জানানো হয়নি।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত ওষুধ শরীরে প্রয়োগের পরও কোনো ব্যক্তির বেঁচে থাকার ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে অত্যন্ত বিরল। মৃত্যুদণ্ড বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতে কয়েকটি ঘটনায় শিরায় ওষুধ প্রয়োগে সমস্যা দেখা দেওয়ায় কার্যক্রম ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু প্রাণঘাতী ওষুধের নির্ধারিত ডোজ দেওয়ার পরও এভাবে জীবিত থাকার ঘটনা নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনাটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চিকিৎসাগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।
গভর্নরের সিদ্ধান্তে স্থগিত মৃত্যুদণ্ড
ঘটনার পর টেনেসির গভর্নর বিল লি চলতি বছরের বাকি সময়ের জন্য অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কার্যক্রম স্থগিত করেন। পাশাপাশি কী কারণে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের প্রক্রিয়া ব্যর্থ হলো, তা খতিয়ে দেখতে স্বাধীন তদন্তের নির্দেশ দেন।
এই সিদ্ধান্তের ফলে টেনেসিতে চলতি বছরে নির্ধারিত আরেকটি মৃত্যুদণ্ডও আপাতত কার্যকর হচ্ছে না। তদন্তে ব্যবহৃত ওষুধ, চিকিৎসা-প্রক্রিয়া, কর্মীদের ভূমিকা এবং কারাগারের নিয়মকানুন পর্যালোচনা করা হতে পারে।
পাইকের আইনজীবীরা ঘটনাটিকে নিষ্ঠুর ও অস্বাভাবিক শাস্তির প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করে আদালতে নতুন আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় পাইক যে শারীরিক যন্ত্রণা ও অস্বস্তির মুখোমুখি হয়েছেন, তা সাংবিধানিক সুরক্ষা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
মৃত্যুদণ্ড নিয়ে নতুন বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড নিয়ে বিতর্ক বহুদিনের। সমর্থকদের মতে, গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে এটি ন্যায়বিচারের একটি বৈধ শাস্তি। অন্যদিকে বিরোধীরা এর নৈতিকতা, ভুল বিচারের ঝুঁকি এবং কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
পাইকের ঘটনাটি সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। বিশেষ করে অপরাধ সংঘটনের সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর। তাঁর আইনজীবীরা অতীতের নির্যাতন, মানসিক স্বাস্থ্য এবং অন্যান্য পরিস্থিতিও বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭৬ সালের পর থেকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া নারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। ফলে টেনেসির এই ঘটনা শুধু একটি ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ডের খবর নয়; বরং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্ভরযোগ্যতা, বন্দিদের অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় শাস্তি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এখন তদন্তের ফল এবং আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে নজর থাকবে। একই সঙ্গে পাইকের চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ আইনি অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
