বিশ্ব রাজনীতির নজর যখন ওয়াশিংটনে, তখন একই টেবিলে বসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। দুই পরাশক্তির এই বৈঠক ঘিরে প্রত্যাশা ছিল বাণিজ্যযুদ্ধ, প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা ও তাইওয়ান ইস্যুতে নতুন কোনো সমঝোতার। কিন্তু বৈঠক শেষে বড় কোনো যুগান্তকারী চুক্তির ঘোষণা না এলেও দুই নেতা সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। একই সঙ্গে স্পষ্ট হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার মৌলিক বিরোধগুলো এখনো বহাল রয়েছে।
২৪ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত বৈঠকটি ছিল শিরোনামে যতটা জাঁকজমকপূর্ণ, ফলাফলের দিক থেকে ততটাই সতর্ক। ট্রাম্প শিকে স্বাগত জানিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের পাশাপাশি নিজেদের ব্যক্তিগত যোগাযোগের কথাও তুলে ধরেন। অন্যদিকে শি জোর দেন চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্থিতিশীলতার ওপর। চীনা প্রেসিডেন্টের বক্তব্য অনুযায়ী, দুই নেতা বিভিন্ন বিষয়ে গভীর আলোচনা করেছেন এবং বেশ কিছু বিষয়ে অভিন্ন বোঝাপড়ায় পৌঁছেছেন।
বাণিজ্যে আপাত স্বস্তি, কিন্তু স্থায়ী সমাধান নয়
বৈঠকের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকগুলোর একটি ছিল দুই দেশের বাণিজ্যিক উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বিদ্যমান বাণিজ্যবিরতি আরও দুই মাস বাড়ানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছে বলে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন। এর ফলে উচ্চমাত্রার শুল্ক আবার দ্রুত ফিরে আসার আশঙ্কা আপাতত কিছুটা কমেছে।
তবে এটিকে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যচুক্তি হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। চীনের কৃষিপণ্য কেনা, বিরল খনিজ সরবরাহ, শুল্ক এবং প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো এখনো আলোচনার টেবিলে রয়েছে। ফলে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সাময়িক স্বস্তি এলেও মূল বিরোধগুলো অমীমাংসিতই থেকে গেছে।
তাইওয়ান নিয়ে শির উল্টো দিকে
বৈঠকের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি ছিল তাইওয়ান। চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দাবি করে এবং দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের তাইওয়ানকে অস্ত্র দেওয়ার বিরোধিতা করে আসছে।
চীনের সরকারি সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, শি ট্রাম্পকে তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন এবং এই ইস্যুতে সতর্ক অবস্থান নেওয়ার কথা বলেছেন। তবে বৈঠকের পর ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তাইওয়ান প্রসঙ্গে বিস্তারিত সরকারি বিবরণ তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন তাইওয়ানের জন্য প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র প্যাকেজের অনুমোদন নিয়ে সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখেছিল। ফলে বৈঠকে তাইওয়ান প্রসঙ্গটি দুই দেশের বৃহত্তর কৌশলগত সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার জায়গা হয়ে ওঠে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় প্রতিযোগিতা
বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই দেশই এআই প্রযুক্তিকে অর্থনীতি, শিল্প এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। উন্নত চিপ, প্রযুক্তি সরবরাহ এবং এআই ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে ইতোমধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে।
শি বৈঠকে এআই উন্নয়নকে মানব নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রযুক্তির উন্নয়ন মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা এবং এর ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। ট্রাম্পও নিরাপত্তা, প্রযুক্তি এবং ভবিষ্যতের সুপারইন্টেলিজেন্স নিয়ে আলোচনার কথা উল্লেখ করেছেন।
‘প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার’ বার্তা
শি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে পরস্পরের অংশীদার হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে দুই দেশের প্রতিযোগিতাকে সংঘাতের দিকে না নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট ছিল। তিনি দুই পরাশক্তির সম্পর্ককে কৌশলগত স্থিতিশীলতার দিকে নেওয়ার নতুন দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলেছেন।
অন্যদিকে ট্রাম্পও শির সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরেছেন এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যকার সম্পর্ক ও পারস্পরিক স্বার্থের কথা বলেছেন। বৈঠকের পরিবেশে কঠোর বাণিজ্য বা নিরাপত্তা বক্তব্যের পরিবর্তে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও স্থিতিশীলতার বার্তাই বেশি দৃশ্যমান ছিল।
বিরোধ মেটেনি, তবে আলোচনার দরজা খোলা
ট্রাম্প–শি বৈঠকের সবচেয়ে বড় বার্তা সম্ভবত কোনো একক চুক্তি নয়, বরং দুই পরাশক্তির মধ্যে যোগাযোগ চালু রাখার চেষ্টা। বাণিজ্যবিরতি বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু শুল্ক ও বাজার প্রবেশাধিকার নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। এআই নিয়ে সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে, কিন্তু প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা শেষ হয়নি। আর তাইওয়ান প্রশ্নে দুই দেশের অবস্থানের পার্থক্যও স্পষ্ট।
ফলে ওয়াশিংটনের এই বৈঠককে যুক্তরাষ্ট্র–চীন সম্পর্কের চূড়ান্ত বাঁক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং সাময়িক উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করে আলোচনার পথ সচল রাখার একটি প্রচেষ্টা হিসেবেই এর তাৎপর্য স্পষ্ট হচ্ছে। আগামী মাসগুলোতে বাণিজ্যবিরতি, তাইওয়ান, প্রযুক্তি ও বিরল খনিজ নিয়ে পরবর্তী আলোচনাগুলোই দেখাবে এই বৈঠকের বাস্তব প্রভাব কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয়।
