ইরাকে ইসলামিক স্টেট বা আইএসবিরোধী আন্তর্জাতিক সামরিক জোটের দীর্ঘদিনের মিশনের সমাপ্তি ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের শেষ সেনারাও দেশটি ছেড়ে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা সামরিক উপস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান হলো।
২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর শেষ সদস্যদের ইরাক থেকে প্রত্যাহারের খবর প্রকাশিত হয়। একই সময়ে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও ইরাকে আন্তর্জাতিক জোটের সামরিক মিশন শেষ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে।
২০১৪ সালে আইএস ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলে আন্তর্জাতিক সামরিক জোট গঠিত হয়। জঙ্গিগোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান, প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনীকে সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে এই জোট কাজ করে আসছিল।
১২ বছরের সামরিক অভিযানের সমাপ্তি
ইরাকে আইএসের উত্থান মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন এনেছিল। জঙ্গিগোষ্ঠীটি ২০১৪ সালে ইরাকের মসুলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহর দখল করে। একই সময়ে সিরিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলও তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
আইএসের দখলদারত্বের বিরুদ্ধে ইরাকি বাহিনী, কুর্দি পেশমার্গা এবং আন্তর্জাতিক জোটের সম্মিলিত অভিযান শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গঠিত জোট বিমান হামলা, প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য এবং সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে ইরাকি বাহিনীকে সহায়তা করে।
২০১৭ সালে ইরাক সরকার আইএসের বিরুদ্ধে সামরিক বিজয়ের ঘোষণা দেয়। তবে জঙ্গিগোষ্ঠীটির অবশিষ্ট সদস্য ও গোপন নেটওয়ার্কের তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক জোটের কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে আসে স্থানীয় বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অবশিষ্ট জঙ্গি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো।
ইরাকি বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে সরকারি মূল্যায়ন
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনী এবং কুর্দি পেশমার্গা বাহিনী আইএসের ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
মন্ত্রণালয়ের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরাকি বাহিনী এখন দেশের নিরাপত্তার প্রধান দায়িত্ব গ্রহণের জন্য প্রস্তুত। ফলে আন্তর্জাতিক জোটের সামরিক মিশন শেষ করে নতুন ধরনের নিরাপত্তা সহযোগিতায় যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে আইএসের অবশিষ্ট নেটওয়ার্ক, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার মতো চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। সামরিক মিশনের সমাপ্তি মানেই জঙ্গিগোষ্ঠীটির সব ধরনের হুমকি শেষ হয়ে যাওয়া নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহারের পর নতুন সমীকরণ
ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার দেশটির রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ সামরিক উপস্থিতি দেশটির রাজনীতি, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সম্পর্কের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল।
বিশেষ করে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব এবং ইরাকের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভারসাম্য ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কমে যাওয়ার ফলে ইরাকি সরকারকে নিজস্ব নিরাপত্তা সক্ষমতার ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জও রয়েছে।
সামরিক মিশন শেষ, সহযোগিতা নয়
ইরাকে আন্তর্জাতিক জোটের সামরিক মিশন শেষ হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে দেশটির নিরাপত্তা সহযোগিতা পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না।
প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অব্যাহত থাকতে পারে। তবে সামরিক উপস্থিতি ও কার্যক্রমের ধরনে পরিবর্তন আসবে।
আন্তর্জাতিক জোটের এই প্রত্যাহার মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা সামরিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নির্দেশ করছে। আগামী দিনে ইরাক কতটা স্বাধীনভাবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং আইএসের অবশিষ্ট হুমকি মোকাবিলা করতে পারে, সেটিই হবে নতুন পর্যায়ের প্রধান পরীক্ষা।
