থাইল্যান্ডের রাজপরিবারে নেমে আসে গভীর শোক। দেশটির রাজা মহা ভাজিরালংকর্নের জ্যেষ্ঠ কন্যা রাজকুমারী বজ্রকিটিয়াভা নারেন্দিরাদেব্যবতী ৪৭ বছর বয়সে মারা গেছেন। প্রায় সাড়ে তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর ১১ জুন ২০২৬ সন্ধ্যায় তাঁর মৃত্যু হয়।
রাজপরিবারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় জানানো হয়, ব্যাংককের কিং চুলালংকর্ন মেমোরিয়াল হাসপাতালে স্থানীয় সময় রাত ৭টা ৪৮ মিনিটে রাজকুমারী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
হৃদ্যন্ত্রের সমস্যার পর দীর্ঘ চিকিৎসা
২০২২ সালের ১৫ ডিসেম্বর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারানোর পর রাজকুমারী বজ্রকিটিয়াভাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রাজপরিবারের পক্ষ থেকে নিয়মিত তাঁর শারীরিক অবস্থার তথ্য জানানো হতো।
প্রাথমিকভাবে হৃদ্যন্ত্রের সমস্যার পর তিনি অচেতন অবস্থায় চিকিৎসাধীন ছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতি ও অবনতির খবর নিয়ে থাইল্যান্ডের জনগণের মধ্যে আগ্রহ ছিল।
২০২৬ সালের মে মাস থেকে তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। রাজপরিবারের ঘোষণায় বলা হয়, বৃহদান্ত্রে প্রদাহের কারণে পেটের ভেতরে সংক্রমণ তৈরি হয়েছিল। এর সঙ্গে নিম্ন রক্তচাপ, অনিয়মিত হৃদ্স্পন্দন এবং রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিকতাও দেখা দেয়। চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও তাঁর অবস্থার উন্নতি হয়নি।
রাজপরিবারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান
রাজকুমারী বজ্রকিটিয়াভা ছিলেন রাজা মহা ভাজিরালংকর্নের জ্যেষ্ঠ সন্তান। ফলে থাই রাজপরিবারে তাঁর একটি বিশেষ অবস্থান ছিল। তাঁর মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর রাজপ্রাসাদে শোকের পরিবেশ তৈরি হয় এবং তাঁর শেষকৃত্যের জন্য রাজকীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন রাজা।
রাজপরিবারের ঘোষণায় জানানো হয়, তাঁর মরদেহ গ্র্যান্ড প্যালেসের বিমন রাতায়া প্যাভিলিয়নে রাখা হবে এবং সর্বোচ্চ রাজকীয় মর্যাদায় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া আয়োজন করা হবে।
থাইল্যান্ডের রাজপরিবারের সদস্যদের মৃত্যুতে সাধারণত দীর্ঘ রাষ্ট্রীয় শোক ও ধর্মীয় আচার পালিত হয়। রাজকুমারীর ক্ষেত্রেও সেই ঐতিহ্য অনুসরণ করা হয়।
আইন ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে পরিচিতি
বজ্রকিটিয়াভার পরিচিতি শুধু রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে ছিল না। তিনি আইন নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন এবং থাইল্যান্ডের বিচারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নারী ও শিশুদের অধিকার, পারিবারিক সহিংসতা এবং বন্দিদের পুনর্বাসনের মতো সামাজিক বিষয়েও তিনি কাজ করেছেন।
তাঁর কর্মকাণ্ডের মধ্যে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধ এবং বিচারব্যবস্থায় মানুষের অধিকার নিয়ে সচেতনতা তৈরির বিষয় ছিল। রাজপরিবারের আনুষ্ঠানিক দায়িত্বের বাইরে এসব কাজ তাঁকে থাইল্যান্ডের সামাজিক পরিসরেও পরিচিত করে তুলেছিল।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও তাঁর আইন ও মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট কাজের বিষয়টি উল্লেখ করেছে। ইউরোনিউজের প্রতিবেদনে নারী ও পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে তাঁর কাজের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
দীর্ঘ অসুস্থতায় জনমনে উদ্বেগ
২০২২ সালে অসুস্থ হওয়ার পর থেকে তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে থাইল্যান্ডে ব্যাপক আগ্রহ ছিল। রাজপরিবার নিয়মিত মেডিকেল বুলেটিন প্রকাশ করলেও দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর শারীরিক অবস্থার বড় ধরনের পরিবর্তন হয়নি।
চার বছরের কাছাকাছি সময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার কারণে তাঁর অসুস্থতা থাইল্যান্ডের রাজপরিবারের সাম্প্রতিক ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য সংকটগুলোর একটি হয়ে ওঠে।
২০২৬ সালের এপ্রিল ও মে মাসে তাঁর অবস্থার অবনতির খবর প্রকাশিত হলে আবারও দেশজুড়ে উদ্বেগ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত ১১ জুন তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে রাজপরিবার।
রাজকীয় মর্যাদায় শেষ বিদায়
মৃত্যুর পর রাজা মহা ভাজিরালংকর্ন রাজকীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন। রাজপ্রাসাদের ঘোষণায় বলা হয়, রাজকীয় ঐতিহ্য অনুসারে তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া হবে।
রাজকুমারীর মৃত্যু থাইল্যান্ডের রাজপরিবারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি। ৪৭ বছরের জীবনে তিনি রাজপরিবারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আইন ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছিলেন।
দীর্ঘ অসুস্থতার পর তাঁর মৃত্যুতে থাইল্যান্ডে শোক নেমে আসে। রাজপরিবারের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পরও তাঁর পেশাগত জীবন ও সামাজিক কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
