রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল কেনা নিয়ে ভারতের সামনে নতুন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। একদিকে রাশিয়ার তেল ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিশোধন শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র রুশ জ্বালানি কেনা বড় দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা তৈরি করেছে। ফলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের সামনে জ্বালানি ব্যয়, রপ্তানি বাজার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক—তিনটি বিষয় একসঙ্গে সামলানোর প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
রয়টার্সের হিসাবে, আগস্টে ভারতের রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ কমে দিনে প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেলে নেমেছে। সেপ্টেম্বরে প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী তা আরও কমে দিনে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ ব্যারেলে নামতে পারে। তবুও রাশিয়া ভারতের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহকারী হিসেবে রয়েছে।
রাশিয়ার তেলের ওপর নির্ভরতা কেন গুরুত্বপূর্ণ
ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক। দেশটির মোট জ্বালানি চাহিদার বড় অংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে রুশ অপরিশোধিত তেল তুলনামূলক সুবিধাজনক দামে পাওয়া যাওয়ায় ভারতীয় পরিশোধনাগারগুলো বড় পরিমাণে রাশিয়ার তেল কিনেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রুশ অপরিশোধিত তেল ভারতের মোট তেল আমদানির ৪০ শতাংশের বেশি পর্যন্ত প্রতিনিধিত্ব করেছে। ফলে হঠাৎ করে রাশিয়ার তেল কমিয়ে দিলে বিকল্প উৎস থেকে তুলনামূলক বেশি দামে তেল কিনতে হতে পারে।
ওয়াশিংটনের নতুন চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা আইনে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের বড় ক্রেতা দেশগুলোর পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের সুযোগ তৈরি হয়েছে। আইনটি প্রেসিডেন্টকে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয়। তবে সর্বোচ্চ হার স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয় না; নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
ভারত সরাসরি এই আইনে নামোল্লেখ করা দেশ নয়। কিন্তু বিশ্বের বড় রুশ তেল ক্রেতা হওয়ায় দেশটি সম্ভাব্য ব্যবস্থার আওতায় পড়তে পারে। ফলে ভারতীয় পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের সময় বাড়তি শুল্কের মুখে পড়লে রপ্তানিকারকদের ওপর বড় চাপ তৈরি হতে পারে।
তেলের দাম বাড়ার ঝুঁকিও আছে
ভারত যদি রুশ তেল দ্রুত কমিয়ে দেয়, তাহলে বিকল্প উৎস থেকে আমদানি বাড়াতে হবে। মধ্যপ্রাচ্য, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব থেকে অতিরিক্ত তেল আনার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সরবরাহ পরিস্থিতি ও পরিবহন ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে এসব উৎস থেকে তেল কেনার খরচ বেশি হতে পারে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ভারত ইতিমধ্যে কিছুটা বিকল্প উৎসের দিকে যাচ্ছে। আগস্টে ইরাক থেকে ভারতের তেল আমদানি প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব থেকেও সরবরাহের পরিবর্তন দেখা গেছে।
বাণিজ্য চুক্তির আলোচনাও জটিল হচ্ছে
যুক্তরাষ্ট্র ভারতের অন্যতম বড় রপ্তানি বাজার। তাই রুশ তেল কেনার কারণে যদি ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক বসে, তাহলে তার প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতে থাকবে না। পোশাক, ওষুধ, প্রকৌশলপণ্যসহ বিভিন্ন রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
রয়টার্স জানিয়েছে, রুশ তেল নিয়ে নতুন চাপের মধ্যেও নয়াদিল্লি ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা পুরোপুরি ছেড়ে দেয়নি। তবে দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনায় এখন জ্বালানি ইস্যুটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
একদিকে মস্কো, অন্যদিকে ওয়াশিংটন
ভারতের জন্য সমস্যাটি শুধু অর্থনৈতিক নয়। রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সম্পর্কও গত কয়েক বছরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ফলে রুশ তেলের প্রশ্নে নয়াদিল্লিকে একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, তেলের দাম, রপ্তানি বাজার এবং দুই পরাশক্তির সঙ্গে সম্পর্ক—সবগুলো বিষয় বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে। সেপ্টেম্বরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ভারত ইতিমধ্যে রুশ তেল আমদানি কিছুটা কমিয়েছে। সামনে এই কমার গতি আরও বাড়ে কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
