টানা ভারী বৃষ্টিতে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে চলে যাওয়ার পর শহরটির সব ৫০টি জেলাকে দুর্যোগপ্রবণ এলাকা ঘোষণা করা হয়েছিল। রাস্তাঘাটে পানি জমে যান চলাচল ব্যাহত হয়, বাড়িঘর ও দোকানে পানি ঢুকে পড়ে এবং নগরজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি উদ্ধার ও পানি নিষ্কাশন কার্যক্রম শুরু করে কর্তৃপক্ষ।
সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে শুরু হওয়া প্রবল বৃষ্টিতে ব্যাংককের খাল ও নিম্নাঞ্চলে পানি দ্রুত বেড়ে যায়। ২৫ সেপ্টেম্বর শহরের সব ৫০টি জেলাকে দুর্যোগ এলাকা ঘোষণা করেন ব্যাংককের গভর্নর চ্যাডচার্ট সিত্তিপুন্ত। পরে বৃষ্টি কমে পানি নামতে শুরু করলে কয়েকটি জেলার পরিস্থিতি উন্নত হয়।
একসঙ্গে বিপর্যস্ত ৫০ জেলা
ব্যাংককের প্রশাসন জানিয়েছিল, কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টির পর শহরের সব ৫০টি প্রশাসনিক জেলায় বন্যার প্রভাব পড়ে। নিচু এলাকার সড়ক ও আবাসিক এলাকায় পানি ঢুকে যায়। কোথাও কোথাও পানির উচ্চতা বাড়তে থাকায় বাসিন্দাদের চলাচলে সমস্যা হয়।
ব্যাংককের নগর কাঠামোর বড় একটি অংশ খাল ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দ্রুত সরিয়ে নেওয়া সম্ভব না হলে অল্প সময়েই শহরের রাস্তায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়।
বন্যার কারণে গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত যানবাহন চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে। অফিসগামী মানুষ থেকে শুরু করে দোকানদার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়। কিছু এলাকায় দোকানপাট বন্ধ রাখতে হয় এবং বাড়িঘরের নিচতলায় পানি প্রবেশ করে।
বৃষ্টির পর পানি নামতে শুরু
টানা বৃষ্টির পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নত হতে থাকে। ২৯ সেপ্টেম্বর থাইল্যান্ডের দুর্যোগ প্রতিরোধ ও প্রশমন বিভাগ জানায়, ব্যাংককের ৫০ জেলার মধ্যে ২১টি জেলা থেকে দুর্যোগের ঘোষণা প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে ২৯টি জেলায় তখনও দুর্যোগ পরিস্থিতির ঘোষণা বহাল ছিল।
কর্তৃপক্ষ জানায়, কিছু এলাকায় পানি কমে গেলেও কয়েকটি জেলায় পরিস্থিতি এখনও গুরুতর। জেলা পর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন করে পুনরুদ্ধার কাজ শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
শুধু রাজধানী নয়, থাইল্যান্ডজুড়ে বন্যা
বন্যার প্রভাব শুধু ব্যাংককে সীমাবদ্ধ ছিল না। ২৯ সেপ্টেম্বরের সরকারি হিসাবে থাইল্যান্ডের ২৯টি প্রদেশে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। প্রায় ৯ লাখ ৪০ হাজার পরিবার এবং ২৬ লাখের বেশি মানুষ কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
দেশের বিভিন্ন নদী ও জলপথে পানি বাড়ছিল। নাখন সাওয়ান, সুপান বুরি, আয়ুথায়া, পাথুম থানি, চাচোয়েংসাও এবং চনবুরিসহ বিভিন্ন এলাকায় পানি বৃদ্ধির খবর পাওয়া যায়।
ব্যাংককের ক্ষেত্রেও আলাদা হিসাবে প্রায় ৩ লাখ ২৯ হাজার পরিবার বন্যার প্রভাবে পড়েছিল।
কেন এত দ্রুত জলাবদ্ধতা
ব্যাংকক সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনামূলক নিচু এলাকায় অবস্থিত। শহরের বিস্তীর্ণ অংশ অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এবং কংক্রিটে ঢাকা। ফলে ভারী বৃষ্টির পানি মাটিতে শোষিত হওয়ার সুযোগ কম। খাল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর তখন অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
একটানা বৃষ্টির সময় নদী ও খালের পানিও বেড়ে গেলে পানি নিষ্কাশনের গতি আরও কমে যেতে পারে। ফলে বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পরও অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা থেকে যায়।
বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিবৃষ্টি এবং নগর বন্যার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করে আসছেন। তবে কোনো নির্দিষ্ট বন্যাকে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের ফল হিসেবে চিহ্নিত করতে আলাদা বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
বাসিন্দাদের দুর্ভোগ
বন্যার সময় ব্যাংককের অনেক বাসিন্দা নিজেদের উদ্যোগে প্রতিবেশীদের সহায়তায় এগিয়ে আসেন। নৌকা ও অন্যান্য ছোট যান ব্যবহার করে পানিবন্দি মানুষকে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকেরা খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করেন।
পানি কমে যাওয়ার পরও শহরের কিছু এলাকায় রাস্তা পরিষ্কার করা, জমে থাকা পানি সরানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি পরিদর্শনের কাজ শুরু হয়।
আগামী দিনের বড় প্রশ্ন
ব্যাংককের সাম্প্রতিক বন্যা আবারও নগর ব্যবস্থাপনা ও পানি নিষ্কাশন অবকাঠামোর সক্ষমতার প্রশ্ন সামনে এনেছে। শুধু জরুরি উদ্ধার নয়, ভবিষ্যতে অতিবৃষ্টির সময় দ্রুত পানি সরিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি হিসাবে পরিস্থিতির উন্নতি শুরু হলেও থাইল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার প্রভাব তখনও ছিল। তাই রাজধানীতে পানি কমে গেলেই পুরো দুর্যোগ শেষ হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন এবং অবকাঠামো মেরামতই হয়ে ওঠে পরবর্তী বড় কাজ।
