ফ্রান্সজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে স্কুলশিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। শিক্ষা খাতের উন্নত পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধান এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি পরিবর্তনের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন দেশটির বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানী প্যারিস থেকে শুরু করে লিওঁ, লিলসহ বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, স্কুল অবরোধ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আন্দোলন তীব্র হওয়ায় দেশটির শিক্ষা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে আরও বিস্তৃত রূপ নেয়। ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১ অক্টোবর দেশটির এক হাজার ২০টির বেশি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় ধর্মঘট অথবা বিক্ষোভের কারণে প্রভাবিত হয়। এর মধ্যে ২২২টি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা সরাসরি প্রবেশপথ অবরোধ করে। দেশটির মোট উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশ কোনো না কোনোভাবে এই আন্দোলনের আওতায় আসে।
প্যারিসের উপকণ্ঠ থেকে দেশজুড়ে আন্দোলন
আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল প্যারিসের উপকণ্ঠ ক্রেতেইয়ের সাঁ-একজুপেরি উচ্চবিদ্যালয়ে। সেখানকার শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ ধীরে ধীরে আশপাশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে। পরে প্যারিসের কেন্দ্রীয় এলাকা এবং দেশের অন্যান্য বড় ও মাঝারি শহরের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে যোগ দেন।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংহতি তৈরির উদ্যোগও দেখা যায়। প্যারিসের ঐতিহ্যবাহী হেনরি-চতুর্থ উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আন্দোলনকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে প্রতীকী কর্মসূচি পালন করেন। বেসরকারি ও ক্যাথলিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কিছু শিক্ষার্থীও এই আন্দোলনে অংশ নেন।
আন্দোলনের বিস্তার প্রমাণ করছে, এটি আর কোনো নির্দিষ্ট বিদ্যালয়ের সমস্যা বা স্থানীয় প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ নেই। বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৃহত্তর অসন্তোষের প্রকাশ হিসেবে এটি নতুন মাত্রা পেয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ
আন্দোলনের অন্যতম প্রধান বিষয় হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন সমস্যা। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবির মধ্যে রয়েছে বিদ্যালয়ের পরিস্থিতির উন্নয়ন, শিক্ষার মান নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার্থীদের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া।
তবে সব বিদ্যালয়ের আন্দোলনকারীদের দাবি এক নয়। বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী বিক্ষোভের কারণ ও অগ্রাধিকারেও পার্থক্য রয়েছে। কিছু শিক্ষার্থী বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রশ্নেও নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন।
আন্দোলনের নেতারা বলছেন, শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলো দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত হওয়ায় প্রতিবাদের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে সরকারের বক্তব্য, শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের দাবি জানানোর অধিকার রয়েছে। তবে সহিংসতা ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার ঘটনাকে সরকার সমর্থন করছে না।
পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, বাড়ছে উত্তেজনা
অক্টোবরের প্রথম দিনগুলোতে আন্দোলন আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ২ অক্টোবর প্যারিসসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। কিছু এলাকায় শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আগুন জ্বালায় এবং পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করে। জবাবে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।
প্যারিসে পুলিশের এক সদস্যকে ধাওয়া করে মারধরের ঘটনাও সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় আন্দোলনের শান্তিপূর্ণ চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও সব বিক্ষোভে সহিংসতা দেখা যায়নি, কিছু স্থানে সংঘর্ষের ঘটনা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
কর্তৃপক্ষের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে একদিকে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের অধিকার নিশ্চিত করা, অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনসাধারণের নিরাপত্তা বজায় রাখা।
বিশ্ববিদ্যালয়েও ছড়াচ্ছে সংহতি
উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও আন্দোলনের প্রতি সমর্থন দেখা যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সংগঠনের দাবি অনুযায়ী, ১ অক্টোবর প্রায় ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা সংহতিমূলক কর্মসূচিতে অংশ নেন। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবরোধের ঘটনাও ঘটে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ফ্রান্স ইউনিভার্সিতের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক ডজন ক্যাম্পাসে অবরোধের ঘটনা ঘটে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুলশিক্ষার্থীদের আন্দোলন পুরোপুরি একীভূত হয়েছে, এমন পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।
শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো নতুন কর্মসূচির আহ্বান জানিয়েছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হতে পারে।
সরকারের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ
ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন এমন এক সময়ে শুরু হয়েছে, যখন দেশটির শিক্ষা খাতের সংস্কার, সরকারি ব্যয় এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। শিক্ষার্থীদের দাবি কতটা পূরণ হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
সরকারের জন্য শুধু বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করাই যথেষ্ট নয়; শিক্ষার্থীদের অসন্তোষের কারণগুলোও মোকাবিলা করতে হবে। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের জন্যও বড় প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে সহিংসতা এড়িয়ে নিজেদের দাবিকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে রাখা যায়।
এক হাজারের বেশি বিদ্যালয়কে প্রভাবিত করা এই আন্দোলন ফ্রান্সের শিক্ষা খাতে চলমান অসন্তোষের একটি বড় বহিঃপ্রকাশ। পরিস্থিতি কোন দিকে এগোয়, তা নির্ভর করবে সরকার ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংলাপ, নতুন কর্মসূচি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর।
