অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন বন্ধ এবং বিদ্যমান সম্প্রসারণের পদক্ষেপ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে চীন। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই আজারবাইজানে এক বৈঠকে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের সঙ্গে আলোচনার সময় এই অবস্থান তুলে ধরেন। গাজায় মানবিক সংকট এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের মধ্যে বেইজিংয়ের এই বক্তব্য নতুন কূটনৈতিক তাৎপর্য তৈরি করেছে।
বসতি সম্প্রসারণ বন্ধের আহ্বান
চীনের বক্তব্য অনুযায়ী, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ বন্ধ করার পাশাপাশি জোরপূর্বক বসতি স্থাপনের কার্যক্রম উল্টে দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। বেইজিংয়ের দীর্ঘদিনের অবস্থান হলো, ফিলিস্তিন সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথ অনুসরণ করতে হবে।
পশ্চিম তীর ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর থেকে ইসরায়েলি দখলদারির মধ্যে রয়েছে। সেখানে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিনের বিতর্কের বিষয়। ফিলিস্তিনিরা মনে করে, এসব বসতি তাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের ভূখণ্ডকে খণ্ডিত করে এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে দুর্বল করে।
ইসরায়েলি সরকার ও বসতি স্থাপনকারীদের একাংশ অবশ্য নিরাপত্তা, ঐতিহাসিক দাবি এবং ভূখণ্ডের সঙ্গে ধর্মীয় সম্পর্কের যুক্তি তুলে ধরে। কিন্তু বসতি সম্প্রসারণের ফলে ফিলিস্তিনি জনপদ, চলাচল এবং জমির অধিকারের ওপর যে প্রভাব পড়ে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।
গাজার মানবিক পরিস্থিতিও আলোচনায়
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশের পথ সম্পূর্ণভাবে খুলে দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন। যুদ্ধের কারণে গাজার জনসংখ্যার বড় অংশ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং খাদ্য, চিকিৎসা, বিশুদ্ধ পানি ও আশ্রয়ের সংকট তীব্র হয়েছে।
বেইজিংয়ের বক্তব্যে বলা হয়েছে, গাজার সাধারণ মানুষকে বেঁচে থাকার ন্যূনতম উপকরণ থেকে বঞ্চিত রাখা যায় না। মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর জন্য প্রবেশপথ সচল রাখা এবং বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ কমানো জরুরি।
গাজার সংকট ও পশ্চিম তীরের বসতি সম্প্রসারণ একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও এগুলো আলাদা বাস্তবতা। গাজায় অবিলম্বে মানবিক সহায়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি; অন্যদিকে পশ্চিম তীরের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে দখল, বসতি, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক সমাধানের প্রশ্নগুলোর ওপর।
চীনের কূটনৈতিক অবস্থানের তাৎপর্য
মধ্যপ্রাচ্যে চীন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কূটনৈতিক ভূমিকা বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। জ্বালানি, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে দেশটি ইসরায়েল ও আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। একই সঙ্গে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে বেইজিংয়ের বক্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তার অবস্থানকে দৃশ্যমান করে।
তবে বক্তব্যের পাশাপাশি বাস্তব কূটনৈতিক চাপ কতটা কার্যকর হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। ইসরায়েলি বসতি নীতিতে পরিবর্তন আনতে হলে আন্তর্জাতিক চাপ, দ্বিপক্ষীয় আলোচনা এবং বৃহত্তর শান্তি প্রক্রিয়ার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের ভবিষ্যৎ
দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের ধারণা অনুযায়ী, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন পাশাপাশি দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নিরাপদে অবস্থান করবে। কিন্তু পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ, গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন, নিরাপত্তা এবং জেরুজালেমের মর্যাদা নিয়ে মতপার্থক্য এই লক্ষ্যকে কঠিন করে তুলেছে।
ফিলিস্তিনিদের জন্য বসতি সম্প্রসারণ বন্ধের দাবি ভূখণ্ড ও রাষ্ট্রীয় অধিকারের প্রশ্ন। ইসরায়েলের জন্য নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্বীকৃতির বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের জন্য উভয় পক্ষের নিরাপত্তা, অধিকার ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে আলোচনায় আনতে হবে।
চীনের আহ্বান এখনই পরিস্থিতি বদলে দেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে পশ্চিম তীর ও গাজার প্রশ্নকে আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রে ধরে রাখার ক্ষেত্রে এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী সময়ে ইসরায়েল কী প্রতিক্রিয়া জানায় এবং আন্তর্জাতিক উদ্যোগ কতটা এগোয়, তা পরিস্থিতির গতিপথ নির্ধারণ করবে।
