ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী এডেনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর দেশটির দীর্ঘদিনের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার জানিয়েছে, হুতি বিদ্রোহীরা এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে শহরের রাষ্ট্রপতি প্রাসাদ এলাকায় প্রাণঘাতী হামলার পরদিন। পরপর দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু হওয়ার ঘটনায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ
ইয়েমেন সরকারের দাবি অনুযায়ী, বিমানবন্দরের কাছাকাছি এলাকায় দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। হামলার সময় সেখানে একটি উড়োজাহাজ উড্ডয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছিল বলে জানা গেছে। নিরাপত্তার স্বার্থে উড়োজাহাজটি সরিয়ে নেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে বিমানবন্দরের হামলায় প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।
হুতিদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের লক্ষ্য ছিল কাছাকাছি একটি সামরিক স্থাপনা, যেখানে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর কমান্ড সেন্টার ও অস্ত্রের গুদাম রয়েছে। তবে ইয়েমেন সরকারের অভিযোগ, এ ধরনের হামলা বেসামরিক মানুষের জীবন এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন অবকাঠামোকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।
বিমানবন্দর শুধু সামরিক বা সরকারি কার্যক্রমের জায়গা নয়; এটি জরুরি চিকিৎসা, মানবিক সহায়তা, বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তাই সেখানে হামলা হলে এর প্রভাব সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে।
রাষ্ট্রপতি প্রাসাদে হামলার পর উত্তেজনা
এডেনের আল-মাশিক রাষ্ট্রপতি প্রাসাদ এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত এবং আরও অনেকে আহত হয়েছেন বলে ইয়েমেনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এই হামলার দায় হুতিদের ওপর চাপানো হয়েছে। তবে সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন পক্ষের দাবি যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রপতি প্রাসাদ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে সেখানে হামলা সরকারের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে পরবর্তী হামলার অভিযোগের কারণে ধারণা করা হচ্ছে, এডেনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এখন সংঘাতের নতুন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
কেন এডেন গুরুত্বপূর্ণ
এডেন ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের একটি কৌশলগত বন্দরনগরী। দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার দীর্ঘদিন ধরে এই শহরকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করছে। বন্দর, বিমানবন্দর এবং উপকূলীয় অবস্থানের কারণে এডেনের গুরুত্ব শুধু ইয়েমেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; লোহিত সাগর ও আরব সাগরের সংযোগপথের আঞ্চলিক নিরাপত্তার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।
এডেনে হামলা বাড়লে সরকারি বাহিনীর চলাচল, সাহায্য পৌঁছানো এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াত ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে বিমানবন্দর ও বন্দরকেন্দ্রিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হলে দেশটির অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সৌদি আরব ও আঞ্চলিক শক্তির ভূমিকা
ইয়েমেনের সংঘাতে সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে। অন্যদিকে হুতিরা দেশের উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। সাম্প্রতিক হামলাগুলো সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সৌদি আরবের ওপর হুতিদের হামলা বাড়লে রিয়াদ সামরিক পদক্ষেপ জোরদার করতে পারে। তাতে পাল্টা হামলা এবং আরও বড় সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হবে। একই সঙ্গে মিসরসহ আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সহযোগিতার আলোচনা পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিতে পারে।
মানবিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা
ইয়েমেনের যুদ্ধ বহু বছর ধরে দেশটির অর্থনীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও খাদ্যনিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। নতুন করে বিমানবন্দর ও সরকারি স্থাপনায় হামলা বাড়লে চিকিৎসা ও ত্রাণ কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। সাধারণ মানুষই এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে পারে।
এডেন বিমানবন্দরে হামলার অভিযোগ তাই শুধু একটি সামরিক ঘটনা নয়; এটি ইয়েমেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। সংঘাত থামাতে কার্যকর আলোচনার উদ্যোগ না এলে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে ঘিরে লড়াই আরও বাড়তে পারে।
