বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি আবারও ভয়াবহ সংঘাতের কেন্দ্রে। কৌশলগত এই জলপথ দিয়ে চলাচলের সময় একের পর এক তেলবাহী জাহাজ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের শিকার হচ্ছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর দাবি, তাদের নির্ধারিত পথ অমান্য করে চলাচলের সময় কয়েকটি তেলবাহী জাহাজ নৌমাইনে আঘাত পেয়েছে। সর্বশেষ ঘটনায় দুটি ট্যাংকার বিস্ফোরিত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। এর আগে আরও কয়েকটি জাহাজে আগুন লাগার খবর সামনে আসে।
ঘটনাগুলো এমন সময়ে ঘটছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা নতুন করে বাড়ছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে তেহরান। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই জলপথের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
একাধিক জাহাজে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড
১ নভেম্বর ইরানের আইআরজিসি নৌবাহিনী দাবি করে, হরমুজ প্রণালিতে তাদের অনুমোদনহীন পথে চলাচলের সময় দুটি তেলবাহী জাহাজ নৌমাইনে আঘাত পেয়ে বিস্ফোরিত হয়েছে। ইরানের অভিযোগ, নির্ধারিত সামুদ্রিক পথ ব্যবহার না করে জাহাজগুলো নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেছিল।
এর আগে ৩০ অক্টোবর ইরানের বিপ্লবী গার্ডের পক্ষ থেকে চারটি তেলবাহী জাহাজে আগুন লাগা ও বিস্ফোরণের খবর দেওয়া হয়েছিল। একটি জাহাজে দুই মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল ছিল বলেও দাবি করা হয়।
তবে এসব ঘটনার সব বিবরণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থাও হরমুজের কাছে একটি তেলবাহী জাহাজ অজ্ঞাত অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর জানিয়েছে। আরেকটি ঘটনায় জাহাজের এক পাশে বিস্ফোরণের পর আগুন লাগলেও নাবিকেরা নিরাপদ ছিলেন বলে জানা গেছে। এসব ঘটনা একই জাহাজকে ঘিরে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়। Reuters+1
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি?
পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে যুক্ত করেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের উল্লেখযোগ্য অংশ এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়।
সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলোর রপ্তানির জন্য এই জলপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে এখানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার জ্বালানি বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো হরমুজ দিয়ে আসা তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বড় অর্থনীতির জ্বালানি সরবরাহে এই প্রণালির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইরানের নিয়ন্ত্রণ আর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ
ইরান দীর্ঘদিন ধরেই হরমুজ প্রণালিকে কৌশলগত চাপ তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। দেশটির যুক্তি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সামরিক হুমকির মুখে নিজেদের জলসীমা ও সামুদ্রিক স্বার্থ রক্ষার অধিকার তাদের রয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল বাধাগ্রস্ত করা গ্রহণযোগ্য নয়। ওয়াশিংটন মনে করে, এই জলপথে বাধা সৃষ্টি হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বর্তমান সংঘাতের মধ্যে ইরান জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। দেশটির দাবি, অনুমোদিত রুট ব্যবহার না করলে জাহাজগুলোকে ঝুঁকির মুখে পড়তে হবে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে হিসাব-নিকাশ করছে।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা
হরমুজ প্রণালিতে প্রতিটি বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। কারণ, কোনো জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লেই বীমা কোম্পানিগুলো ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে চলাচলের জন্য অতিরিক্ত প্রিমিয়াম দাবি করতে পারে।
একই সঙ্গে জাহাজগুলো বিকল্প পথ ব্যবহার করতে বাধ্য হলে পরিবহন ব্যয় ও সময় বাড়বে। এতে তেল ও গ্যাসের সরবরাহে বিলম্ব হতে পারে।
যদি পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওপর।
নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ
জাহাজে আগুন লাগা কিংবা নৌমাইনে বিস্ফোরণের ঘটনায় শুধু জ্বালানি সম্পদের ক্ষতি হয় না, বিপদের মুখে পড়েন শত শত নাবিক। সমুদ্রের মাঝখানে আগুন লাগলে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন। আবার তেল ছড়িয়ে পড়লে সামুদ্রিক পরিবেশেরও ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে।
এ কারণে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে আরও সতর্ক অবস্থানে থাকতে হচ্ছে। জাহাজ চলাচলের রুট, নৌবাহিনীর উপস্থিতি এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
বড় সংঘাতের আশঙ্কা কতটা?
হরমুজে ধারাবাহিক বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলছে। একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জবাবে সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে পরিস্থিতি দ্রুত বড় যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
তবে প্রতিটি ঘটনার দায়, ক্ষয়ক্ষতি এবং হামলার প্রকৃত ধরন এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি। ফলে কোনো একটি পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে পুরো পরিস্থিতির চূড়ান্ত ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে বিস্ফোরণ ও আগুনের ঘটনা এখন আর শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর সামরিক হিসাব-নিকাশ। আগামী দিনগুলোতে এই জলপথে জাহাজ চলাচল কতটা নিরাপদ থাকে, তার ওপর নির্ভর করবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের পরিস্থিতিও।
