আজকের রঙিন, ঝকঝকে ও উচ্চপ্রযুক্তির টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হয়েছিল এক শতাব্দী আগে, অত্যন্ত সাধারণ একটি যন্ত্রের মাধ্যমে। তখন টেলিভিশনের ছবি ছিল অস্পষ্ট, সাদা-কালো এবং ঝাপসা। কিন্তু সেই অস্পষ্ট ছবিই বদলে দিয়েছিল মানুষের যোগাযোগ ও বিনোদনের ভবিষ্যৎ। আশ্চর্যের বিষয় হলো, টেলিভিশনের পর্দায় প্রথম মানুষের মুখ দেখানোর পেছনে ছিলেন না কোনো বিখ্যাত অভিনেতা বা রাজনীতিবিদ। ছিলেন লন্ডনের এক তরুণ অফিসকর্মী।
টেলিভিশনের পর্দায় প্রথম মানুষ কে?
টেলিভিশনের ইতিহাসে প্রথম স্বীকৃত চলমান মানবমুখের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত উইলিয়াম এডওয়ার্ড টেন্টন। ১৯২৫ সালের ২ অক্টোবর স্কটিশ উদ্ভাবক জন লোগি বেয়ার্ড তাঁর পরীক্ষাগারে টেন্টনের মুখের চলমান ছবি টেলিভিশন যন্ত্রের মাধ্যমে অন্য প্রান্তে পাঠাতে সক্ষম হন।
সেই সময় টেন্টনের বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর। তিনি লন্ডনের সোহো এলাকায় একটি প্রতিষ্ঠানে অফিসকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর কর্মস্থলের ওপরের তলায় পরীক্ষাগার তৈরি করেছিলেন বেয়ার্ড। সেখানেই চলছিল নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা।
এর আগে বেয়ার্ড একটি পুতুলের মাথার ছবি যন্ত্রের মাধ্যমে পাঠাতে সক্ষম হয়েছিলেন। তবে জীবন্ত মানুষের মুখের নড়াচড়া পর্দায় ফুটিয়ে তোলা ছিল অনেক বেশি কঠিন। টেন্টনের মুখের ছবি সফলভাবে পাঠানোর মধ্য দিয়ে সেই বাধা অতিক্রমের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
কেমন ছিল প্রথম টেলিভিশনের ছবি?
বর্তমান সময়ের টেলিভিশনের সঙ্গে তুলনা করলে প্রথম দিকের ছবিগুলোকে প্রায় অবিশ্বাস্য রকমের নিম্নমানের মনে হবে। ছবিতে স্পষ্ট চোখ, নাক কিংবা মুখের অভিব্যক্তি বোঝা কঠিন ছিল। আলো-ছায়ার অস্পষ্ট রেখার মধ্যে দিয়ে মানুষের মুখের নড়াচড়া কোনো রকমে শনাক্ত করা যেত।
বেয়ার্ডের তৈরি যন্ত্রটি ছিল যান্ত্রিক প্রযুক্তিনির্ভর। এতে দ্রুত ঘূর্ণায়মান ছিদ্রযুক্ত চাকতি ও আলোর সাহায্যে কোনো বস্তুর ছবি পর্যায়ক্রমে বিশ্লেষণ করা হতো। এরপর সেই তথ্য বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে পাঠিয়ে অন্য প্রান্তে ছবিটি পুনর্গঠন করা হতো।
এই প্রক্রিয়ায় ছবির মান ছিল সীমিত। তবু স্থির ছবি নয়, বরং চলমান কোনো মানুষের মুখ পর্দায় দেখা সম্ভব হওয়াটাই ছিল যুগান্তকারী ঘটনা।
টেন্টন পরবর্তী সময়ে স্মৃতিচারণে জানিয়েছিলেন, বেয়ার্ডের পরীক্ষাগারটি ছিল তার, তার ও নানা যন্ত্রপাতিতে ভরা। সেখানে ব্যবহৃত তীব্র আলোর কারণে বেশিক্ষণ যন্ত্রের সামনে বসে থাকাও কঠিন ছিল।
কেন টেন্টনকে বেছে নিয়েছিলেন বেয়ার্ড?
পরীক্ষার জন্য এমন একজন মানুষের প্রয়োজন ছিল, যিনি ক্যামেরার সামনে বসে মুখের নড়াচড়া করতে পারবেন। পুতুলের মাথা দিয়ে প্রাথমিক পরীক্ষা সফল হলেও জীবন্ত মানুষের মুখের অভিব্যক্তি ধারণ করাই ছিল পরবর্তী লক্ষ্য।
বেয়ার্ডের পরীক্ষাগারের আশপাশেই কাজ করতেন টেন্টন। তাই তাঁকে পরীক্ষায় অংশ নিতে অনুরোধ করা হয়। টেন্টন প্রথমে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করলেও শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় অংশ নেন।
পরীক্ষার সময় তাঁকে মুখ নড়াতে এবং জিহ্বা বের করে বিভিন্ন অভিব্যক্তি তৈরি করতে বলা হয়েছিল। অতিরিক্ত তাপের কারণে তাঁকে বারবার সরে যেতে হচ্ছিল। তবু বেয়ার্ডের কাছে পরীক্ষাটি সফল হওয়া ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অবশেষে যন্ত্রের অপর প্রান্তে টেন্টনের মুখের চলমান ছবি দেখা যায়। এতে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন বেয়ার্ড। তাঁর বহুদিনের গবেষণা যে বাস্তব ফল দিতে শুরু করেছে, তা তখন স্পষ্ট হয়ে যায়।
প্রথম টেলিভিশন প্রদর্শনী কবে হয়েছিল?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। টেলিভিশনের পর্দায় প্রথম মানবমুখের ছবি পাঠানো এবং জনসমক্ষে টেলিভিশন প্রযুক্তির প্রদর্শনী—দুটি আলাদা ঘটনা।
১৯২৫ সালের ২ অক্টোবর বেয়ার্ড টেন্টনের মুখের চলমান ছবি সফলভাবে পাঠান। এরপর ১৯২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি লন্ডনের রয়্যাল ইনস্টিটিউশনের সদস্যদের সামনে তিনি তাঁর উদ্ভাবিত টেলিভিশন ব্যবস্থা প্রদর্শন করেন। এই প্রদর্শনীকে কার্যকর টেলিভিশন প্রযুক্তির ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
প্রদর্শনীতে উপস্থিত বিজ্ঞানী ও পর্যবেক্ষকেরা এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে পাঠানো ছবিতে নড়াচড়া দেখতে পেয়েছিলেন। ছবির মান তখনো অস্পষ্ট ছিল, কিন্তু বাস্তব মানুষের মুখের অভিব্যক্তি ও নড়াচড়া পর্দায় পুনরুৎপাদন করা সম্ভব হয়েছিল।
বেয়ার্ডের এই সাফল্য প্রমাণ করে যে দূরে থাকা কোনো ব্যক্তির চলমান ছবি বৈদ্যুতিক সংকেতের সাহায্যে অন্য স্থানে পাঠানো সম্ভব।
সেখান থেকে আজকের টেলিভিশন
টেলিভিশনের আবিষ্কার কোনো একজন ব্যক্তির একক প্রচেষ্টায় সম্পন্ন হয়নি। এর পেছনে ছিল বহু বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবকের দীর্ঘদিনের গবেষণা। ছবি বিশ্লেষণ, বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে তথ্য পাঠানো এবং পর্দায় সেই ছবি পুনর্গঠনের ধারণা নিয়ে উনিশ শতক থেকেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছিল।
বেয়ার্ডের যান্ত্রিক টেলিভিশন সেই গবেষণাকে বাস্তব ব্যবহারের কাছাকাছি নিয়ে যায়। পরে উন্নত ইলেকট্রনিক প্রযুক্তি টেলিভিশনের ছবির মান ও সম্প্রচারের সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
১৯৩৬ সালে যুক্তরাজ্যে বিবিসি নিয়মিত উচ্চমানের টেলিভিশন সম্প্রচার শুরু করে। এরপর কয়েক দশকের মধ্যে টেলিভিশন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের ঘরে পৌঁছে যায়। সংবাদ, খেলাধুলা, নাটক, সিনেমা ও সরাসরি সম্প্রচার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।
আজকের স্মার্ট টিভি, উচ্চ রেজল্যুশনের পর্দা কিংবা সরাসরি সম্প্রচারের পেছনে রয়েছে সেই প্রাথমিক পরীক্ষাগুলোর অবদান।
টেলিভিশনের ইতিহাসে তাই উইলিয়াম টেন্টনের নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি ছিলেন না কোনো তারকা, বিজ্ঞানী কিংবা রাজনীতিবিদ। কিন্তু এক তরুণ অফিসকর্মী হিসেবে তাঁর অংশগ্রহণ প্রযুক্তির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। তাঁর মুখের সেই অস্পষ্ট চলমান ছবিই যেন আধুনিক টেলিভিশন যুগের সূচনাপর্বের প্রতীক হয়ে রয়েছে।
