উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন নতুন চালু হওয়া সীমান্ত সেতু পেরিয়ে চীনে আকস্মিক সফর করেছেন। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়ানোর সম্ভাবনার পাশাপাশি এই সফর উত্তর-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও বিশেষ গুরুত্ব তৈরি করেছে।
২৪ অক্টোবর চীনের সীমান্তবর্তী শহর দানদংয়ে পৌঁছান কিম। উত্তর কোরিয়ার সিনুইজু শহরকে চীনের দানদংয়ের সঙ্গে যুক্ত করেছে ইয়ালু নদীর ওপর নির্মিত নতুন সেতুটি। দীর্ঘদিন নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার পরও চালু হতে বিলম্ব হওয়া এই সেতু চলতি মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহারের জন্য খুলে দেওয়া হয়। কিমের এই যাত্রা দুই দেশের সম্পর্ক জোরদারের প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাণিজ্য ও যোগাযোগে নতুন সম্ভাবনা
প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের সেতুটি দিয়ে ভারী ট্রাক ও পণ্যবাহী যান চলাচলের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক আদান-প্রদান বাড়তে পারে। জ্বালানি, কাঁচামাল, শিল্পপণ্য ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সামগ্রী পরিবহনেও সেতুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, মহামারির সময় সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবহনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে দুই দেশের বাণিজ্যিক যোগাযোগ বিভিন্ন সময়ে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। নতুন সেতুটি সেই যোগাযোগ আরও সহজ করার সুযোগ তৈরি করছে।
চীনের শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ
চীনের দানদংয়ে সফরকালে কিম দেশটির জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতা ওয়াং হুনিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের শুভেচ্ছাও কিমের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতা নিয়ে ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হয়েছে।
সফরের অংশ হিসেবে কিম ও চীনা প্রতিনিধিদল একটি গাড়ি কারখানা পরিদর্শন করেন। পাশাপাশি কোরীয় যুদ্ধের সময় নিহত চীনা সেনাদের স্মরণে নির্মিত একটি স্মৃতিসৌধেও শ্রদ্ধা জানান তাঁরা।
১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধের সময় চীন উত্তর কোরিয়ার পক্ষে সামরিক সহায়তা দিয়েছিল। দুই দেশের সরকারি বক্তব্যে সেই ঐতিহাসিক সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে এবারের সফর কেবল অর্থনৈতিক যোগাযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দুই দেশের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্কের বার্তাও।
সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক হয়নি
সফরটির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, কিম এবার চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেননি। একই দিনে চীন সফর শেষ করে দেশে ফিরে যান তিনি। এর আগে তাঁর চীন সফরগুলোতে বিশেষ ট্রেন বা উড়োজাহাজ ব্যবহারের নজির থাকলেও এবার নতুন সেতু পেরিয়ে সড়কপথে যাতায়াত বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে।
২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর এটি কিমের ষষ্ঠ চীন সফর। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বেইজিংয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির ৮০তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পর এটিই ছিল তাঁর প্রথম চীন সফর।
আঞ্চলিক রাজনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
চীন উত্তর কোরিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মিত্র ও প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়ার সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার করেছে পিয়ংইয়ং। এই পরিস্থিতিতে চীনের সঙ্গে যোগাযোগ সম্প্রসারণ উত্তর কোরিয়ার কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্কও দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনাপূর্ণ। এমন পরিস্থিতিতে বেইজিংয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখা কিমের জন্য অর্থনৈতিক ও কৌশলগত—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ।
তবে নতুন সেতু চালু হওয়া এবং কিমের সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হলেও এর বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে ভবিষ্যতে বাণিজ্য কতটা বাড়ে এবং দুই সরকার সহযোগিতার বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয় তার ওপর।
সেতুটি এখন উত্তর কোরিয়া ও চীনের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর নতুন পথ। এর মাধ্যমে বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্প্রসারিত হলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর হতে পারে। একই সঙ্গে এই উদ্যোগ এশিয়ার পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও নতুন গুরুত্ব পেতে পারে।
